রোজার মাসে নিত্যপয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই নাকাল সাধারণ মানুষ, তার ওপর অসাধু ব্যবসায়ীদের ভেজাল পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে ভেজাল সেমাই উৎপাদন হচ্ছে এই অঞ্চলের যত্রতত্র। বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) অভিযান চালিয়েও থামাতে পারছে না ভেজাল পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন। গত বৃহস্পতিবার দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে নকল ও অনুমোদনহীন লাচ্ছা সেমাই কারখানায় এক লাখ টাকা জরিমানা ও এক টন সেমাই জব্দ করা হয়।
বিএসটিআই সূত্রমতে, খাদ্য দ্রব্য ও পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল রোধ এবং ওজন ও পরিমাপে সঠিকতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার দিনাজপুর জেলার হাকিমপুরের বিভিন্ন এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এসময় পণ্যের মান সনদ না থাকা ও নকল ব্রান্ডের মোড়কে লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন ও বিক্রয়-বিতরণ করার অপরাধে বিএসটিআই আইন, ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বেশ কয়েকটি কারাখানা মালিকের জরিমানা করা হয়।
হাকিমপুরের ডাঙ্গাপড়া এলাকায় মেসার্স ছাবের আলী লাচ্ছা সেমাই কারখানাকে ৫০ হাজার, মেসার্স একতা লাচ্ছা সেমাই কারখানাকে ২৫ হাজার, মেসার্স কালাম ফুড প্রোডাক্টসকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ২০ হাজার, মেসার্স রিমি ফুড প্রোডাক্টসকে ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি মান যাচাইবিহীন প্রায় এক মেট্রিকটন লাচ্ছা সেমাই জব্দ করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নূর-এ-আলম। আদালতকে সহায়তা করেন বিএসটিআই রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার (সিএম) মেসবাহ-উল-হাসান ও পরিদর্শক মিঠুন কবিরাজ।
বিএসটিআই’র উপপরিচালক (পদার্থ) ও বিভাগীয় অফিস প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ বলেন, ঈদুল ফেতর উদযাপনের প্রধান উপকরণ সেমাই। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল সেমাই তৈরি করে বাজারজাত করছেন। জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহায়তায় বিএসটিআই’র এমন অভিযান চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।
সেমাই তৈরির কারখানার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান মেলেনি। তবে বেকারি কারখানাগুলোতে তৈরি হচ্ছে লাচ্ছাসহ মোটা সেমাই ও বগুড়ার চিকন সেমাই। এছাড়া ঈদকে ঘিরে একশ্রেণির অসাধু ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করছেন লাচ্ছা সেমাই। তাদের পাশাপাশি অনুমোদিত অনেক কারখানাতেও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ভেজাল লাচ্ছা উৎপাদন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ সেমাই কারখানায় বিরাজ করছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। শ্রমিকের গায়ের ঘাম আর নিম্নমানের পামওয়েলের মিশ্রণ মিলেমিশে একাকার করে তৈরি হচ্ছে লাচ্ছা সেমাই। যদিও কারখানায় অবাধ আলো-বাতাস প্রবেশের সুবিধাসহ উন্নত ব্যবস্থাপনা, কারিগরদের এপ্রোন ও বিশেষ ধরণের হাতমোজা পরা বাধ্যতামূলক। লাচ্ছার উপকরণ হিসেবে উন্নত ময়দা, ভেজিটেবল ফ্যাটওয়েল, ডিম, ঘি, ডালডা ব্যবহার করার কথা থাকলেও তার কোনো বালাই নেই। বরং মেঝেতে ছড়ানো পামওয়েলের ড্রামের ওপরই নিম্নমানের ময়দায় সেমাইর খামির করা হচ্ছে। কোথাও মেশিনের পাশাপাশি পা দিয়েও খামির তৈরি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবান তৈরির এনিমেল ফ্যাট, নিম্নমানের ময়দা, পামওয়েল এবং ঘিয়ের কৃত্রিম সুগন্ধি ছিটিয়ে এসব লাচ্ছা ভাজার পর নামি-দামি কোম্পানির নকল মোড়কে দেওয়া হচ্ছে খোলাবাজারে। প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনের তারিখ, কোম্পানির নাম, মেয়াদ, উপকরণের নাম নেই। আবার অনেকে প্যাকেট ছাড়াই অনেকটা খোলা অবস্থায় বাজারজাত করছে লাচ্ছা সেমাই।
নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উৎপাদকরা পাইকারি ও খুচরা দরে এসব লাচ্ছা রংপুর বিভাগের আট জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে দদারছে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞসহ সচেতন মহলের দাবি, ভেজাল উপকরণে তৈরি এসব লাচ্ছা বিশাল জনগোষ্ঠিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলবে।
রংপুর জেলা কনফেকশনারী মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব নূরুল ইসলাম মুন্না বলেন, অবৈধ মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কারণে আমাদের লাচ্ছার বিক্রি কমে গেছে। পাশাপাশি সুনামও নষ্ট হচ্ছে। এ ব্যাপারে সব বৈধ ব্যবসায়ী ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনাসহ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। বিএসটিআই’র উপপরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশিদ জানান, ঈদকে ঘিরে পঁচা ডিম, এনিমেল ফ্যাট এবং কৃত্রিম ঘি ও সুগন্ধি মিশ্রিত ভেজাল লাচ্ছা সেমাই যাতে তৈরি না হয় সেজন্য কারখানাগুলোতে নজরদারি রাখা হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আবু মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, এসব ভেজাল লাচ্ছা খেলে ডায়রিয়াসহ মানুষের পেটের পীড়া, লিভার সিরোসিস হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের সমস্যা বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।
আনন্দবাজার/শহক









