মৌলভীবাজার শহরের সেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা আকরাম খাঁন। পেশায় বেসরকারি চাকরিজীবী। নিত্যপণ্যের দামে একেবারেই কাহিল অবস্থা তার। বলেন, নতুন দামে সয়াবিন তেল কিনলাম। হাজার টাকায় পৌঁছে গেছে। মাস শেষ না হতেই যদি চাল ডাল আর তেল কিনতে বেতনের টাকা শেষ হয় তাহলে চলবো কী করে?
একই রকম প্রশ্ন শহরের মুসলিম কোয়ার্টারের বাসিন্দা নাসির আহমদের। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বলেন, ঈদের পরে চারজনের সংসারের জন্য দু’কেজি দুধ আর দু’লিটার সয়াবিন কিনতে ফিরে এলাম। পরে বাধ্য হয়েই গ্রামের বাজার থেকে বাড়তি দামে কিনেছি। দুই লিটার না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়ে ৫ লিটার সয়াবিন কিনতে গিয়ে সেখানেই হাজার টাকা খরচ করতে হলো।
মৌলভীবাজার শহরের শান্তিবাগের বাসিন্দা ইউনুস মিয়া চাকরি করেন এমএলএম কোম্পানিতে। অনেক কষ্টে চলতে হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে সবকিছুর দামই আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। ব্যয় তো ভাই বেড়েই চলেছে। বেতন তো বাড়ছে না। কীভাবে যে কুলিয়ে উঠবো ভেবে পাচ্ছি না।
শহরের কুসুমবাগ এলাকার বাসিন্দা মাহেদ আহমদ পেশায় একজন রিকশা চালক। মা-বাবা ভাই বোনমিলে ছয়জনের সংসার। বলেন, আমি একা বিকশা চালিয়ে যে আয় করি তাকে কিছুই হয় না। মা অন্যের বাসায় কাজ করে। দিন শেষে কোনো রকমে চারটা ডাল-ভাত জোটে আরকি। তিনি সয়াবিন কেনা নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। খোলা বাজার থেকে সামান্য তেল কেনেন। তবে দাম বাড়ার পর মুশকিল হয়ে পড়েছে।
মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিম বাজারের ব্যবসায়ী সাহেল আহমদ বলেন, ঈদের দুদিন আগে থেকে এক-দুই-তিন লিটার সয়াবিন তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুধের সাপ্লাইও বন্ধ ছিল। তবে ঈদের পরে দুধের সাপ্লাই কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আবার সয়াবিন তেলের সাপ্লাই কিছুটা বাড়লেও প্রায় দ্বিগুণ দামে ক্রেতারা কিনতে এসে হতাশ হচ্ছেন।
বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। পরিবারে একমাত্র উপার্জন ক্ষম জিসান মির্জা। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। কারখানায় কাজ করে যা পান তা দিয়েই সংসার চালান। তবে বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ার কারণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বলেন, পরিবারের অনেক চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। সয়াবিন কিনতে গিয়ে নিজেকে অসহায় লাগে। তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার রান্না বাড়িতে আর হয় না। আমরা যেন নিজের সংসারে যাযাবর।
আবির ওয়াসিম দূর্জয় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করেন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে। থাকেন কলেজ সংলগ্ন একটি ছাত্রাবাসে। কাঁচা বাজার করতে এসে তিনি বলেন, বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পড়াশোনা করছি। ছাত্রাবাসে থেকে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় হিমশিম খাচ্ছি আমরা। এমনিতেই বাড়ি ছেড়ে বাইরে থাকছি। তারপরেও মাসের ধরে দেয়া হাত খরচে ঠিকমতো চলা যাচ্ছেনা। কিন্তু বাসা থেকেও খরচের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ আমি ছাত্রাবাসে পণ্যের দামে দুর্ভোগের শিকার আর বাড়িতে পরিবারও একইভাবে চলছে। সব মিলিয়ে দুর্ভোগ চারদিকে। এমন পরিস্থিতিতে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াই কঠিন।
মৌলভীবাজার শহরের মতো সারাদেশের মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেকটা কমে গেছে। অনেকেই নিত্যপণ্যের অনেক কিছুই কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার বাড়তি আয়ের উপায় বের করার চিন্তায় পড়েছেন।
উত্তরাঞ্চলের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন। মহানগরীর পবা উপজেলার ভালাম ভবানীপুর এলাকার শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, বাজারে যে সব পণ্যের দাম বেড়েছে তাতে পরিবার নিয়ে জীবন চালানোয় দায়। এ সমস্যা থেকে কবে মুক্তি পাবো জানি না।
রাজশাহী মহানগরীর বড় বোনগ্রাম এলাকার মসজিদের ইমাম মোখলেছুর রহমান বলেন, বেতন খুব সীমিত। আয় বাড়েনি। কিন্তু বিপরীতে পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস আরো বাড়বে।
মূলত, রমজান মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার কিছুটা গরম থাকে। এটাও অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্রান্ত হলেও সাধারণ ক্রেতারা এ পরিস্থিতি’র সঙ্গে কষ্ট হলেও মানিয়ে যায়। কিন্তু ঈদের পরে আবার কমে আসে পণ্যের দাম। তবে এবার চিত্র উল্টো। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ার কারণে বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ কারণে ঈদের পরেও বাজারগুলোতে নিত্যে প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে। আমদানীকারকদের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠছে।
এক সপ্তাহ আগেও রাজশাহীর বাজারে এক কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ২০ থেকে ২৩ টাকা। কিন্তু গতকাল শুক্রবার রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা যায় পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। সপ্তাহ ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১২ থেকে ১৫ টাকা। রাজশাহীর বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে কাঁচামরিচ ডাল ও ডিমের দাম। প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে, মুরগি, মাংসসহ বিভিন্ন সবজির দাম।
বাজারে কাঁচমরিচের দাম উর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহের চেয়ে কেজিতে কাঁচামরিচ ২০ টাকা বেড়ে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও মসুর ডাল কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং মুরগির লাল ডিম হালিতে ৬ বেড়ে ৩৮ টাকা ও সাদা ডিম ৪ টাকা বেড়ে ৩৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ঈদের আগে থেকে বাজারে ভোজ্য তেলের দাম ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়িয়ে দিলে সাধারণ ক্রেতারা বোতলজাত ও খোলা তেল, পামওয়েল পাচ্ছিলো না। ঈদের পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন দেশব্যাপি সাড়াশি অভিযান শুরু করলে ব্যসায়ীদের গোডাউন হতে ব্যারেল ব্যারেল তেল বেরিয়ে আসতে থাকে। এতে করে আর্থিক জরিমানা ও গ্রেপ্তারও করা হয়। এতো কিছুর পরেও স্বাভাবিক হচ্ছে না বাজার।
আনন্দবাজার/শহক









