- আচিক ভাষা পাঠ্যসূচিতে চায় গারো শিশুরা
- নিজ এলাকাতেই তারা এখন ‘সংখ্যালঘু’
- সোয়া লাখ গারোর ২০ হাজারই মধুপুরে
২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতিমালায় শিশুদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। তবে আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
লামিসা রিছিল, সেংবিয়া রিছিল, মেলডি চিরান, কচিল সিমসাং, জোতি, ঈশান রিছিল। ওরা সবাই সমবয়সী। কেউ তৃতীয়, চতুর্থ আবার কেউ পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ওরা টাঙ্গাইলের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা মধুপুর উপজেলার ভূটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। ওই স্কুলটিতে লামিসাদের মতো শতকরা ত্রিশ শতাংশ শিশুই আদিবাসী। লামিসাদের পড়াতে সরকার স্কুলটিতে তিনজন গারো শিক্ষকের কোটাও রেখেছেন।
মার্জিনা চিসিমের মতো গারো শিক্ষিকাদের সঙ্গে আদিবাসী শিশুদের অন্যরকম মিতালি। স্কুলে ভর্তি বা শিক্ষক উভয় সুবিধা পাচ্ছে এসব শিশুরা। তবে নেই ওদের মায়ের ভাষায় পাঠ্য। পরিবারের সঙ্গে মন খুলে ওরা কথা বলে অচিক ভাষায়। কিন্তু স্কুলে এসে পড়তে হয় বাংলা ভাষায়। যদিও শিশুরা সরকারিভাবে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত আচিক ভাষায় পাঠ্য পেয়েছে তবে এতোটুকু যথেষ্ট না। ওদের মাতৃভাষার চর্চার জন্য নূন্যতম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্য চায় অচিক ভাষায়।
একটা সময় ছিল যখন এ অঞ্চলের গারোরা আচিক ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতো না। কিন্তু জীবন-জীবিকার তাগিদে বনের গারোরা এসেছে তাদের আশেপাশে বাঙালি প্রধান এলাকায়। এভাবে এক সময় নিজ এলাকাতেই আদিবাসী গারোরা পরিণত হয়েছে ‘সংখ্যালঘু উপজাতিতে’। গারো শিক্ষার্থীদের স্কুলে লেখাপড়া ও কর্মজীবনে অফিস আদালতসহ সকল কাজ কর্মেই তাদের বাংলা ব্যবহার করতে হয়। ফলে তাদের মাতৃভাষার চর্চা কমে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্রমেই “আচিক ভাষা” হারিয়ে যাচ্ছে। গারোদের মাতৃভাষা ‘আচিক’ রক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এ অবস্থা হচ্ছে বলে আদিবাসীদের দাবি। এ ভাষা রক্ষার জন্য গারো শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের সোয়া লাখ গারো আদিবাসীর মধ্যে প্রায় ২০ হাজারের বসবাস মধুপুর গড় অঞ্চলে। স¤প্রতি মধুপুর গড়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্কুল পড়–য়া শিশুরা অধিকাংশই তাদের মাতৃভাষা ভালোভাবে জানেনা। কেউ কেউ নিজ বাড়িতে বাবা মায়ের মুখে শুনে এ ভাষা সর্ম্পকে কিছুটা বুঝতে শিখলেও তারা আচিক ভাষায় উত্তর দিতে পারে না।
ভূটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা মার্জিনা চিসিম বলেন, মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য আমরা নিজেরা বাড়িতে সব সময় আচিক ভাষায় কথা বলি। কিন্তু তবুও আমাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। নিজ বাড়ি ছাড়া কোথাও আমরা আমাদের মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছি না। এতে এ প্রজম্ম এ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা পিয়ারা বেগমও সহমত জানালেন।
প্রাচীন ইতিহাসে জানা যায়, গারোদের আচিক ভাষার লিখিত কোনো বর্ণমালা নেই। কথিত আছে দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশ তিব্বত অঞ্চল ত্যাগ করে গারোরা যখন ভারতীয় উপমাহাদেশে আসছিলেন তখন যার কাছে পশু চামড়ায় লিখিত আচিক ভাষার পুঁথি-পুস্তকাদি ছিল, সেই ব্যক্তি পথে ক্ষুধার জ্বালায় সব পুঁথি পুস্তক সিদ্ধ করে খেয়ে ফেলেন। তিনি সম্পূর্ণ ব্যপারটি গোপন রাখেন। পরবর্তীতে এ উপমহাদেশে আগমন ও বসতি স্থাপনের দীর্ঘদিন পরে ঘটনাটি প্রকাশ পায়। কিন্তু ততদিনে গারো বর্ণমালা বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে যায়। কারণ এ উপমহাদেশে প্রবেশের পর নিজেদের অস্তিত্বরক্ষা এবং স্থায়ী বাসযোগ্য স্থান নির্বাচনের জন্য দীর্ঘদিন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ করে অভিজ্ঞ গারোরা প্রাণহারান। ফলে আচিক ভাষার বর্ণমালা চিরতরে হারিয়ে যায়। তবে বর্ণমালা হারিয়ে গেলেও গারোদের মুখে মুখে আচিক ভাষা প্রচলন ছিল।
জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক জানান, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে গড় এলাকায় ১২টি স্কুল চালু করা হয়েছিল। যেখানে গারো শিশুদের আচিক ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হতো। কিন্তু তিন বছর চলার পর দাতা সংস্থার অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতিমালায় শিশুদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে আগামী প্রজন্ম অচিক ভাষা নিয়ে শঙ্কায়। তিনি আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
আনন্দবাজার/শহক









