অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতিতে পাকিস্তানকে অনেক আগেই পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। এখন ভারতকেও সেই কাতারে নিয়ে গেছে। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তানে ও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাধীনতার নাগপাশ থেকে স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছরে বাংলাদেশ এই কীর্তি অর্জন করলো। ২০২১ সালের ৩০ মে’তেও ভারতের ৫৫ টাকার সমান ছিল বাংলাদেশের ১০০ টাকা। বর্তমানে ভারতের ৮৬ টাকা সমান বাংলাদেশের ১০০ টাকা। চলতি বছরের বিশ্বব্যাংকের আউটলুক রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রোথ বা বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অপরদিকে ভারতের বৃদ্ধির হার মাইনাস ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ। মাথাপিছু গ্রোস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট-জিডিপি ১ হাজার ৮৮৭ দশমিক ৯৭ মার্কিন ডলার। সেখানে ভারতের জিডিপি ১৮৭৬ দশমিক ৫৩ মার্কিন ডলার। সে হিসেবে জিডিপিতে ১১ দশমিক ৪৪ মার্কিন ডলার বেশি বাংলাদেশের।
আন্তজার্তিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী জিডিপি বৃদ্ধি ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকবে। কেননা ২০১০ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩৮৪ আর বাংলাদেশের ৭৮১ মার্কিন ডলার। পার্থক্য ছিল ৬০৩ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ১১ বছরে এই পার্থক্য দূর করে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৪৪ ও বাংলাদেশের ৮৮৩ মার্কিন ডলার। ২০২১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হয় ২ হাজার ১৩৮ ও ভারতের ২ হাজার ১১৬ মার্কিন ডলার।
তবে আইএমএফ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, তাতে দেখানো হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে ২ হাজার ৩২৬ ও ভারতের ২ হাজার ৩১২ মার্কিন ডলার। সেক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ আয়ে এগিয়ে থাকবে ১৪ মার্কিন ডলার বেশি। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে ৩ হাজার ২৫৩ ও ভারতের ৩ হাজার ১৮ মার্কিন ডলার। আয়ের ক্ষেত্রে ২৩৫ মার্কিন ডলার পার্থক্য থাকবে।
তবে শুধু যে অর্থেই এই পরিবর্তন তা নয় বরং জীবনধারণ ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। ভারতের গড় আয়ু হচ্ছে ৬৯ দশমিক ৪ বছর আর বাংলাদেশে তা ৭২ দশমিক ৩ বছর। তাতে ২ দশমিক ৯ বছর বাংলাদেশে বেশি। বেড়েছে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও। ভারতে নারী শ্রমিকের হার ২০ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে ৩৬ শতাংশ। বিশেষ করে তৈরি পোশাকখাতে ৬০ শতাংশই নারী শ্রমিক। আবার লিঙ্গ সাম্যে বাংলাদেশ বিশ্বে ৫০তম হলেও ভারত ১১২তম। এক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে ৬২ ধাপ ওপরে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল হাঙ্গার প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব ক্ষুধা তালিকাতেও এগিয়ে গেছে। ভারত ক্ষুধা তালিকায় বিশ্বে ৯৪তম ও বাংলাদেশ ৭৫তম। তাতে ১৯ ধাপ ওপরে বাংলাদেশ। অর্থাৎ ভারতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি।
তবে দুইদেশের মধ্যে এমন পার্থক্য থাকলেও অনেক খাতেই পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ২০১০-১১ সালে ভারতে রপ্তানি করে ৫১২ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তার বিপরীতে আমদানি করে ৪৫৬৯ দশমিক ২০ মার্কিন ডলারের পণ্য। বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়ায় ৪০৫৬ দশমিক ৬৯ মার্কিন ডলার। ২০১১-১২ সালে রপ্তানি করে ৪৯৮.৪২, আমদানি ৪৭৫৫ ও বাণিজ্যঘাটতি ৪২৫৬.৫৮ মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ সালে রপ্তানি করে ৫৬৩.৯৬, আমদানি ৪৭৭৬.৮০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৪২১২.৮৪ মার্কিন ডলার।
২০১৩-১৪ সালে রপ্তানি করে ৪৫৬.৬৩ ও আমদানি ৬০৩৬, বাণিজ্যঘাটতি ৫৫৭৯.৩৭ মার্কিন ডলার। ২০১৪-১৫ সালে রপ্তানি করে ৫২৭.১৬, আমদানি ৫৮১১.৯০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৫২৮৪.৭৪ মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ সালে রপ্তানি করে ৬৮৯.৬২, আমদানি ৫৪৫০.৭০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৪৭৬১.০৮ মার্কিন ডলার। ২০১৬-১৭ সালে রপ্তানি করে ৬৭২.৪০, আমদানি ৬১৬২.২০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৫৪৮৯.৮০ মার্কিন ডলার। ২০১৭-১৮ সালে রপ্তানি করে ৮৭৩.২৭, আমদানি ৮৬১৯.৪০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৭৭৪৬.১৩ মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ সালে রপ্তানি করে ১২৪৮.০৫, আমদানি ৭৬৪৮.০০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৬৩৯৯.৯৫ মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ সালে রপ্তানি করে ১০৯৬.৩৮, আমদানি ৫৭৯৩.৬০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৪৬৯৭.২২ মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ রপ্তানি করে ১২৭৯.৬৭, আমদানি ৮৫৯৩.৫০ ও বাণিজ্যঘাটতি ৭৩১৩.৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ভারতে বেশি। এখানে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি বেশি। এসব ঘাটতি পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাপতি, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান গত ২১ ডিসেম্বর হেরিটেজ কলেজ কলকাতা এবং গোয়েনকা কলেজ অফ কমার্স অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ‘কনটেম্পোরারি ইস্যুজ ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেইড: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচ্যুনিটিজ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রস্তাব রাখেন। যেখানে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ- এই দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির যে উৎসাহ দেখিয়েছেন তার সুফল ইতোমধ্যেই পেতে শুরু করেছি। এশিয়ায় এখন ভারতই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং ভারতে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, কালনা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বৃহৎ সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মোট যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করে তার মাত্র ৫ শতাংশ তারা করছে নিজেদের মধ্যে। ফলে এটি অর্থনৈতিক সংযুক্ততার বিচারে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উপলব্ধি করা হচ্ছে। ড. আতিউর বলেন, করোনাজনিত অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং তার পরপরই রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকটের ফলে বিশ্বমানবতা যে হুমকির মুখে পড়েছে তা কাটিয়ে উঠতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতেই হবে। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ভারতকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
সম্প্রতি ভারত সফর করে এসেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। গত ২৭ ডিসেম্বর সফর পরবর্তী এক প্রেস কনফারেন্সে মন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের চাহিদা মোতাবেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রয়োজনীয় চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা এবং ডাল আমদানি করে থাকে। অনেক সময় ভারত হঠাৎ করে পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। এর ফলে বাংলাদেশকে সমস্যায় পড়তে হয়। ভারত সরকার এ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বার্ষিক কোটা নির্ধারণ করতে সম্মত হয়েছে। বিগত বেশ কয়েক বছরের আমদানি-রপ্তানির তথ্য পর্যালোচনা করে এ সকল পণ্যের বার্ষিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানিপণ্য পাটজাত সামগ্রী ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে এন্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করেছে। এ ডিউটি প্রত্যাহারের বিষয়ে ভারত সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের (৫-৮ সেপ্টেম্বর ২০২২) সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী সাথে আলোচনা করে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সেপা) নামে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য একমত হয়েছিলেন। সেটা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পাদন করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করে একমত হওয়া গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রদান এবং বিভিন্ন প্রকার শুল্ক/ অশুল্ক বাধা অপসারণের মাধ্যমে বাণিজ্য সহজিকরণ, ভারত হতে উচ্চ ফলনশীল রাবার ক্লোন আমদানি, ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ভিসা প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ভারত এ সকল বিষয়ে বাংলাদেশকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ডলারের পরিবর্তে ভারতীয় রুপি ব্যবহারের বিষয়ে ভারত প্রস্তাব দিয়েছে। সফরকালে বাণিজ্যমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারতের পক্ষে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী শ্রী পিয়ুশ গয়াল ও অর্থমন্ত্রী শ্রীমতি নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আনন্দবাজার/শহক









