টানা তিন মাস বন্ধ থাকার পর খুলে দেয়া হয়েছে সুন্দরবন। এতে পর্যটক, মৎস্যজীবি ও বনজীবিরা অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারছেন। স্বস্তি ফিরেছে উপকূলীয় এলাকার সুন্দরবন নির্ভর মানুষের মধ্যে।
গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার আশায় হাজারো জেলে পাস নেওয়ার জন্য ফরেস্ট স্টেশনগুলোতে ভিড় করেন। অভাব-অনটনে পড়ে থাকা বনজীবিরা কষ্ট ভুলে ফের নতুন উদ্যোমে রুজির সন্ধানে ফিরছেন সুন্দরবনে। এছাড়া প্রথম দিনেই পর্যটকদের ভিড় ছিল দৃশ্যমান। উন্মুক্তের প্রথমদিনে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পেরে বেজায় খুশি তারা।
বন বিভাগ বলছে, তিন মাস বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণিরা নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে পেরেছে। বিভিন্ন ধরণের বন্যপ্রাণির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচরণ বেড়েছে হরিণসহ বন্য প্রাণির। বনের বিভিন্ন এলাকায় বাঘের ডাকও শোনা গেছে। সেই সঙ্গে বনের নদী, খালে মাছও বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সুন্দরি, গেওয়া, গরানের বনে এখন সবুজের সমারোহ।
বন বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য বোর্ড লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে ২ হাজার ৯শ টি। এরমধ্যে নবায়ন হয়েছে ২৭৯৬টি। খুলনার কয়রা উপজেলার বানিয়াখালী, কাশিয়াবাদ ও কোবাদক স্টেশনসহ খুলনা রেঞ্জের আওতায় ২ হাজার ৯০০টি নৌকার বিএলসি রয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনে পর্যটকদের জন্য ৭টি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেন। এ ছাড়াও পর্যটকদের জন্য নতুন করে আরও ৪টি ইকো ট্যুরিজমগুলো কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে।
কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের বনজীবি ইউনুস বলেন, দীর্ঘ তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ ছিল। এ সময়ে বিকল্প কাজ না থাকায় কষ্টে দিনতিপাত করেছি। আগে যেতে পারলে বেশি মাছ পাব এ আশায় আগে এসেছি।
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কাঁকড়া আহরণকারী আনিছুর রহমান বলেন, আমি সারাজীবন সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ধরে সংসার চালিয়ে আসছি। তিন মাস পাস বন্ধ থাকায় কষ্টে জীবনযাপন করেছি।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, পদ্মা সেতু’র ফলে বর্তমানে উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় পর্যটনশিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। তবে খুলনা থেকে কয়রা যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সেটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশীসহ কয়রা সদর ও মহারাজপুরের কিছু অংশ এলাকা ভৌগলিক কারণেই সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষ অধ্যুষিত। এসব এলাকায় অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক জেলে পরিবারের বসবাস। এ জেলেরা সারা বছর সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিন মাস সুন্দরবনের নদ-নদীতে সব ধরনের মাছ, কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকায় সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোর মানুষ এতোদিন বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছে। মহাজনের কাছ থেকে আগাম ঋণও নিয়েছেন অনেকে। সুন্দরবন খুলে দেয়ায় এবার দুঃখের অবসান হওয়ার আশা করছি।
নীলডুমুর ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, সাতক্ষীরা রেঞ্জের জন্য অন্তত ১০০টি পর্যটক ট্রলার রয়েছে। জেলে বাওয়ালীদের সাথে ট্রলার মালিক-শ্রমিকদেরও দুর্দিন কেটেছে। কারণ এখানকার ট্রলারগুলো শুধুই পর্যটকদের জন্য। এখন সবার প্রত্যাশা-ঘুড়ে দাঁড়ানোর।
ট্যুর অপারেটর এ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক এম নাজমুল আলম ডেভিড বলেন, রয়েছে। পদ্মাসেতু হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন উপকূলীয় জেলা খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা এলাকায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে । প্রথম দিনেই খুলনা ও ঢাকা থেকে ১টি করে লঞ্চযোগে পর্যটক প্রবেশ করেছে। চলতি মাসে বেশ অগ্রিম বুকিং নেয়া। অতিরিক্ত চাপ সামলানোর প্রস্তুতি বনবিভাগের নেই বলে অভিযোগ জানান তিনি।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির জানান, দীর্ঘ তিনমাস বন্ধ থাকার পর আজ সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। পর্যটকদের প্রায় ৯০ শতাংশ এ এলাকা দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। আমাদের সকল ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ায় পর্যটকদের ভিতর একটা ফিলিংস কাজ করছে বর্ষায় সুন্দরবন দেখার জন্য। সকাল থেকে বেশ কিছু পর্যটক আসতে শুরু করছে। এ বর্ষা মৌসুমে এতো পর্যটক আশার কথা না।
খুলনা রেঞ্জের কয়রা কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ আক্তারুজ্জামান জানান, ৯২ দিন পর সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে করে আবার কর্ম চাঞ্চল্য ফিরে আসবে। জেলেদের সমস্যা দূর হবে। বৃহষ্পতিবার কয়রা উপজেলার তিনটি স্টেশন থেকে ৭০০ বিএলসি’র নৌকায় ১ হাজার ৪০০ জন জেলে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক এবং জেলেসহ সব ধরণের মানুষের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীরা নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে পেরেছে। যার সুফল হিসেবে সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীর প্রজনন বৃদ্ধি পেয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। ১৮৭৮ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে সুন্দরবনের অবস্থান। দুইশ বছর আগে মূল সুন্দরবনের বিস্তৃত ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার। তবে সংকুচিত হতে হতে বর্তমানে আয়তন এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারে। সুন্দরবনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পড়েছে বাংলাদেশে আর বাকিটা ভারতে। এ হিসেবে সুন্দরবনের বাংলাদেশের অংশ প্রায় ৫ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে চার হাজার একশ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ ও এক হাজার ৭০০ বর্গ কিলোমিটার জলাভূমি।
বিশ্বজুড়ে সুন্দরবনের খ্যাতি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর চিত্রল হরিণের জন্য। তবে এখানে বানর, কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন, অজগর ও বনমোরগ ছাড়াও রয়েছে কয়েকশ প্রজাতির প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ ও দুইশ’রও বেশি প্রজাতির মাছ। এসব বন্য প্রাণী ও সুন্দরবনের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ছুটে আসেন।
১৯৯৬ সালে সুন্দরবনের এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৯৯ দশমিক ৪৯৬ হেক্টর এলাকা অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। তখন সুন্দরবনের মোট আয়াতনের শতকরা ২৩ ভাগ অভয়ারণ্য ছিল। এর ২১ বছর পর ২০১৭ সালে সরকার সুন্দরবনে অভয়ারণ্য এলাকা সম্প্রসারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ঐ প্রজ্ঞাপনে নতুন করে বনের আরও এক লাখ ৭৮ হাজার ২৫০ দশমিক ৫৮৪ হেক্টর এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সব মিলে বর্তমানে সুন্দরবনের মোট তিন লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ দশমিক ০৮ হেক্টর এলাকা অভয়ারণ্য। এখন সুন্দরবনের মোট আয়াতনের শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি অভয়ারণ্য এলাকা। সুন্দরবনের নাম স্বার্থক করতেই রয়েছে সারি সারি সুন্দরী গাছ। এছাড়াও রয়েছে গরান, গেওয়া, কেওরা ধুন্দল, গোলপাতাসহ প্রায় তিনশ প্রজাতির বৃক্ষ।









