ধান-চালের ভরা মৌসুমেও বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন ধানের প্রভাব পড়েনি চালের বাজারে। এরপরও মিলগেট থেকে খুচরা বাজার সবখানেই বিরাজ করছে অস্থিরতা। দেশের ধান-চালের বড় মোকাম নওগাঁয় সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে চালের দাম।
ঈদের পর প্রকারভেদে পাইকারি বাজারে বেড়েছে প্রতি কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা। আর খুচরা বাজারে তা ৫ থেকে ৭ টাকা। বাজারে সরবরাহের ঘাটতির কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। এমন পরিস্থিতিতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। যদিও মৌসুম শুরুর দিকে চালের দাম খানিকটা কমে গেলে স্বস্তি দেখা যায় ভোক্তাদের মধ্যে।
দেশের মোট চালের প্রায় ৫৫ শতাংশ বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়। বাজারের সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে আসে বরাবরই। তবে এবার মৌসুমের শুরুতেই দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। নতুন চাল বাজারে এসে যখন দাম কমার কথা, তখন সরবরাহ কমে গিয়ে বেড়েছে দাম। অনেকেরই প্রশ্ন ভরা মৌসুমে বাজারে চালের সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে মুনাফা লোভীদের কারসাজি রয়েছে। অনেকেই আগামীতে বেশি দাম পাওয়ার আশায় ধান চাল কিনে গুদামে ভরছেন। সে কারণে সরবরাহ কমে গেছে।
পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার বিঘা প্রতি ৬ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত ধানের উৎপাদন কমে গেছে। সেই সঙ্গে শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধানের দামের সঙ্গে চালের দামও বেড়েছে। সপ্তাহ খানেক আগে বাড়া শুরু করে চালের দাম। কিছুদিন আগেও মোকামগুলো থেকে ২৫০০ টাকায় ৫০ কেজির বাস্তা কেনা গেলেও বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে ২৬৫০ টাকায়। ঈদের পর প্রকারভেদে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা আর খুচরা বাজারে ৫ থেকে ৭ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তা প্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত।
খুচরা চাল ব্যবসায়ী উত্তম কুমার বলেন, বর্তমানে বাজারে নতুন ধান এলেও সরবরাহ পুরোদমে শুরু হয়নি। ফলে ধান সংকটে চালের দাম কিছুটা বাড়ছে। নওগাঁর খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি কাটারিভোগ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়, জিরাশাইল পুরাতন ৬০ টাকা, জিরাশাইল নতুন ৫৪ টাকা, স্বর্না-৫ এবং মোটা ২৯ জাতের চাল ৫৩ থেকে ৫৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়।
এব্যাপারে একাধিক ভোক্তা বলেন, ধান ও চাল কিনে রেখে ভবিষ্যতে ভালো মুনাফা করার সুযোগ খুঁজছেন ব্যবসায়ীরা। উচ্চহারে শুল্ক আরোপের কারণে বিদেশ থেকে চাল আমদানির সুযোগ কম, প্রতিযোগিতাও কম। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী ও চালকলের মালিক ধান কিনে রাখতে বিনিয়োগ করছেন। যা সরবরাহে টান তৈরি করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নওগাঁর খুচরা বাজারে চাল কিনতে আসা শমসের আলী বলেন, আমার জীবনে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না যে ধান-চালের ভরা মৌসুমে চালের দাম বৃদ্ধি। এটা ব্যবসায়ীদের কারসাজি। ধান-চাল মজুদ করার চক্রান্ত করছে তারা। ঊর্ধ্বগতির বাজারে এমনিতেই ক্রেতাদের নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে, এর ওপর নতুন করে শুনতে হলো চালের দাম বৃদ্ধি। ভরা মৌসুমেও যদি এভাবে চালের দাম বাড়ে তবে সাধারণ ক্রেতারা কেমনে চলবে?
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, ঈদের পর থেকে আকাশ খারাপ হওয়ায় কৃষকদের কাছ থেকে মিলাররা ধান কিনে মিলে নিয়ে শুকাতে পারছে না। তাই বাজারে চালের আমদানি একেবারেই কম হওয়ায় দাম একটু বেশি। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিঘা প্রতি ৬ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কম। উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ধান কেনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এ জন্য ধানের দাম বাড়ছে। আর এ কারণেই চালের দাম একটু বেড়েছে। বোরো ধান পুরোদমে উঠে এলে দাম আবার স্বাভাবিক হবে।
তবে বাজারে ধান বা চালের দাম বাড়লেও তেমন লাভ হচ্ছে না চাষিদের। তারা বলছেন, লাভ তো যায় ব্যবসায়ী আর মজুতদারদের পকেটে। আমাদের তো কিছুই থাকে না। কয়েকজন ধান চাষির সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ধানচাষে এমনিই খরচ বেড়েছে। এর ওপর ভরা মৌসুমে শ্রমিক সংকটে ধান ঘরে তোলাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। বেশি টাকা গুণেও শ্রমিক মিলছেনা। এমনকি এক দেড় মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিক নিতে হচ্ছে। বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় উৎপাদন খরচ উঠছে না।
আনন্দবাজার/শহক









