অর্থনীতির আকার বাড়ছে। বাড়ছে মাথাপিছু আয়ও। মেগা প্রকল্পে বদলে যাচ্ছে গোটা দেশের অবকাঠামোর চিত্র। বাজেটের আকার বাড়ছে প্রতিবছর।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বরাদ্দও বাড়ছে। তারপরও ছিন্নমূল, অভাবী, ভিক্ষুক নির্মূল হচ্ছে না। শহর-বন্দরে যত্রযত্র ভাসমান মানুষের দেখা মিলছে।
প্রাচীনকাল থেকেই মানবসমাজে প্রচলন ছিল ভিক্ষার মতো আদিম পেশার। ভারতীয় উপমহাদেশে ভিক্ষাবৃত্তির ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ-ব্যধি, অশিক্ষা, কুশিক্ষার কারণে ভিক্ষাবৃত্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল সমাজে। বর্তমান সময়ে সেই চিত্র পাল্টে গেলেও সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বরং কিছু মানুষের অলসতা, কর্মবিমুখতা আর স্বার্থন্বেষী মহলের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তি।
মূলত, ভিক্ষাবৃত্তি দেশে স্বীকৃত কোনো পেশা নয়, বরং সামাজিক ব্যধি হিসেবে ধিকৃত। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির আকার দিন দিনই সম্প্রসারিত হচ্ছে। মাথাপিছু আয়ও বেড়ে যাচ্ছে। বিশাল বিশাল মেগা প্রকল্প বদলে দিচ্ছে গোটা দেশের অবকাঠামোর চিত্র। প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বরাদ্দও বেড়ে যাচ্ছে। তারপরও দেশে ছিন্নমূল, অভাবী, ভিক্ষুকের সংখ্যা কম নয়। শহরে ভাসমান মানুষের দেখা মিলছে যত্রতত্র।
আজ থেকে এক দশক আগে ২০১০ সালে সরকারের নেয়া ‘ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল ও পুনর্বাসন কর্মসূচি’ চলমান থাকলেও আজও বিলুপ্ত হয়নি ভিক্ষাবৃত্তি। ২০১৩ সালে পুনর্বাসনের মাধ্যমে ভিক্ষুকদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার যে কর্মসূচি নেয়া হয়, সেটা তেমন সফল হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক যে উন্নয়ন ঘটেছে, স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণ ঘটছে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় তাতে ভিক্ষাবৃত্তির লজ্জা থেকে দেশকে মুক্ত করার সময় এসে গেছে। তবে ভিক্ষাবৃত্তি বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রে সরকার যে পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে মাঠ পর্যায়ের সেই পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অভ্যাসগত কারণেই বেশিরভাগ ভিক্ষুক ভিক্ষাবৃত্তিতে ফেরেন।
সমাজকল্যাণ অধিদফতরের তথ্যমতে, ঢাকায় নিয়মিত ভিক্ষুকের সংখ্যা আগে ছিল ৫০ হাজারের মতো। করোনা মহামারির কারণে ভিক্ষুকের সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে। ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ঠেকেছে অন্তত আড়াই লাখে। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে রমজান মাসে ভিক্ষুকের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যায়। ভিক্ষাবৃত্তির এমন প্রবণতা থেকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকের কাছে ভিক্ষাবৃত্তি একটা পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ভিক্ষা করতে করতে এক সময় সেটা নেশায় পরিণত হয় তাদের।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এলাকা ঘুরে সরেজমিনের এমন চিত্রই দেখতে পেয়েছেন আনন্দবাজারের এই প্রতিবেদক। অনেক এলাকায় গড়ে উঠেছে স্বল্প পরিসরে ভিক্ষুক পল্লী। তারা সকাল বেলা দল বেধে কাজের উদ্দেশে বের হন। সন্ধ্যার পর পল্লীতে ফেরেন। দিন শেষে পাঁচশ থেকে সাতশ বা এক হাজার টাকাও আয় হয়।
রাজধানীর পূর্ব মানিকনগর এলাকার নবনির্মিত একটি সড়কের উপর বসে থাকা একদল ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা হয়। ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন ভোর ৬টা। ৮ থেকে ১০ জন মানুষ সারিবদ্ধভাবে সেখানে বসে আছেন। এরা সবাই ভিক্ষুক। তাদের পেছনেই রয়েছে একটি রিকশাগ্যারেজ। এর সঙ্গে রয়েছে টিনশেডের পুরনো বেশ কয়েকটি বাড়ি। সেখানে বসবাস করেন ৩০ থেকে ৪০ জন ভিক্ষুক। ভিক্ষাবৃত্তিকে তারা পেশা হিসেবে দেখছেন। প্রতিদিন তাদের গড় আয় ৭শ থেকে এক হাজার টাকা। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ভোরে সরেজিমনে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।
ষাটোর্ধ্ব জুলহাস। গত তিরিশ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। জুলহাস জানান, দেশের উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট জেলায় তার বাড়ি। যুবক বয়সে কৃষি পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তার পায়ের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। এরপর থেকে নেমে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে। দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। গ্রামে নির্মাণ করেছেন পাকা বাড়ি, সংসারে এসেছে স্বচ্ছলতা। তারপরও ছাড়তে পারছেন না ভিক্ষাবৃত্তি। পরিবার থেকে নিষেধ করা হলেও ভিক্ষা করা তার নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি। জুলহাস আরও বলেন, কোনো কোনো দিন সকালে নাশতা না করেই কাজে বেরিয়ে পড়েন। কাজটাই হচ্ছে আসল। কাজ না করলে তো আর কেউ খাওন দেয় না।
সেখানে কথা হয় হালিমা বেগম নামে আরো এক নারীর সঙ্গে। তার ভাঙা বাম হাতটি ব্যান্ডেজ অবস্থায় গলায় ঝোলানো রয়েছে। তিনি জানান, তার প্রতিবন্ধী এক মেয়ে রয়েছে। তাকে নিয়েই ভিক্ষা করতে যান। তার স্বামী আবুল কাশেমও ভিক্ষা করেন। প্রতিদিন একা বের হলে ৫০০ টাকা আর প্রতিবন্ধী মেয়েকে হুইল চেয়ারে করে নিয়ে বের হলে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় তার।
সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভিক্ষা করেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। যার জন্য অনেকে ভিক্ষা দিতে চায় না। তাছাড়া মানসিকতা বুঝে কৌশলে ভিক্ষা চাইতে পারলে বেশি উপার্জন করা যায়। ভিক্ষাবৃত্তিকে তিনি কাজ হিসেবে দেখছেন বলে জানান।
অন্যান্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে যে সব ভিক্ষুক থাকেন তাদের প্রায় সবাই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ভাতা পেয়ে থাকেন। প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকদের নামে রয়েছে ভাতার কার্ড। টিটিপাড়ায় বস্তি ভেঙে দেওয়ার পর গত চার বছরের বেশি সময় ধরে ৩০ থেকে ৪০ জন ভিক্ষুক এখানে বসবাস করেন। একটি কক্ষে ৩ থেকে ৪ জন থাকেন। ভাড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকা। এখানে বসবাসকারীদের কেউ প্রতিবন্ধী। আবার অনেকের হাত কিংবা পা কাটা। যাদের অধিকাংশের বাড়ি কুড়িগ্রাম, শেরপুর, মাদারীপুর, নীলফামারী, জয়পুরহাট ও লালমানিরহাট এলাকায়। বুধবার সকালে রাজধানীর জিন্দাবাজার এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ত্রাণ নেওয়ার জন্য সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান।
ফরিদ নামে একজন বলেন, রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকাতে ভিক্ষা বেশি পাওয়া যায়। অপরদিকে শনিরআখড়া, ডেমরা, যাত্রাবাড়ি ও কাজলা এলাকায় ভিক্ষা কম পাওয়া যায়। এছাড়া হাত-পা কাটা ও প্রতিবন্ধীরা বেশি ভিক্ষা পায়। ভবিষ্যত পরিকল্পনা সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিন বেলা খেইয়ে পরে চইলে যেতে পারলেই হয়।
রাজধানীর সবুরবাগে থাকেন প্রতিবন্ধী রবিউল। হুইল চেয়ারে বসে গলায় প্রতিবন্ধীর কার্ড ঝুলিয়ে ছোট্ট একটি শিশুকে সঙ্গে নিয়ে সকালেই ভিক্ষা করতে নেমে পড়েন তিনি। বলেন, অধিকাংশ সময় হামারা পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া মাছ, ব্রয়লার মুরগী দিয়ে ভাত খাই। হামারা কাম করতাম পারি না। তাই ভিক্ষা করিয়া খাই। সারাদিন ভিক্ষা করিয়া যা পাই, তা স্ত্রী-সন্তানের লাগিয়া পাঠাই।
সরকারি তথ্যসূত্র বলছে, ২০১০ সাল থেকে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হলেও তেমন ব্যাপকতা পায়নি আজও। বর্তমান সরকার ভিক্ষাবৃত্তির মতো সামাজিক ব্যধিকে চিরতরে নির্মূলের বিষয়ে অনেক বেশি আন্তরিক হওয়ায় ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো দেশের ৫৮টি জেলায় ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে। এরপর থেকে এ খাতে অন্তত ৩৫ কোটি টাকার বরাদ্দ করা হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যাও অন্তত ১৫ হাজারের মতো। ভিক্ষুকদের মধ্যে অনেকেই সরকারি অর্থসহায়তা পাওয়া কিংবা পুনবার্সিত হলেও পরে নেশা বা অভ্যাসের কারণেই আবারো ফিরেছে ভিক্ষাবৃত্তিতে।
আনন্দবাজার/শহক









