নতুন জাতে নতুন উদ্যম
- উদ্ভাবন হয়েছে সরিষার নতুন নতুন জাত
- আমন-বোরোর মাঝখানে বাড়তি ফসল
- কম খরচে লাভ বেশি
এক সময় মাঠ জুড়ে আবাদ হতো সরিষা। মিল-কারখানা না থাকলেও উৎপাদিত সরিষা নিজস্ব ঘানিতে তেল মাড়াই করা হত। খাঁটি এ সরিষার তেলই ছিল প্রতিটি কৃষক পরিবারে তরকারি রান্নার মূল উপাদান। তখনকার দিনে স্থানীয় জাতের যে সরিষার আবাদ হত তার ফলন ছিল একেবারেই কম। এছাড়া প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন নতুন নতুন ফসলের আবাদ বেড়ে যাওয়ায় সরিষা আবাদে ভাটা পড়ে যায়। বর্তমান সময়ে আধুনিক কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাতের সরিষার উদ্ভাবন হওয়ায় রংপুর অঞ্চলে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে সরিষার আবাদ। চলতি বছর রবি ফসল হিসেবে উৎপাদিত সরিষাই বোরোচাষের খরচ যোগাতে কৃষকদের সম্বলে পরিণত হয়েছে।
কৃষকরা জানান, বর্তমানে এ অঞ্চলে বোরো আবাদের ভরা মৌসুম চলছে। সরিষা উত্তোলনের পরই তারা ওই জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করেন। অন্যান্য ফসলের চেয়ে বোরো চাষে খরচ বেশি। কিন্তু তাদের খাদ্য চাহিদার সিংহভাগই যোগান দেয় বোরো ধান। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের পুঁজি না থাকায় তারা প্রতিবছর সরিষা, আলুসহ রবি মৌসুমে চাষকৃত ফসল বিক্রির টাকায় বোরো চাষের খরচ যোগান। ক’বছর ধরে ধান, পাট, আলু, গমসহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে আলুতে ব্যাপক লোকসান হওয়ায় বোরো আবাদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চলতি বছর রবি মৌসুমে বিকল্প ফসল হিসেবে তারা ব্যাপক জমিতে সরিষা চাষ করেন। ফলনও হয়েছে ভালো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ অঞ্চলে প্রচলিত সরিষার জাত টরি-৭ এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবন করেছে উচ্চ ফলনশীল সরিষার জাত বারি সরিষা-৪, বারি সরিষা-৯, বারি সরিষা-১১, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫ ও বারি সরিষা-১৬, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবন করেছে বিনা সরিষা-৪ ও বিনা সরিষা-৫। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) উদ্ভাবন করেছে বিএডিসি সরিষা-১ নামের একটি উচ্চ ফলনশীল সরিষার জাত। এসব সরিষার ফলন হয় প্রতি একরে ৬০০ থেকে ৮০০ কেজি (প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৬ মণ)।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আলুর বিকল্প হিসেবে ব্যাপক জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। ক্ষেতগুলোতে হলুদ ফুল ঝরে পড়লেও চকচক করছে সরিষার শুটি (ফল)। কোথাও কোথাও পরিপক্ক হওয়ায় ক্ষেত থেকে সরিষা উত্তোলন করছেন কৃষকরা। যারা আগাম আমন ধান কর্র্তনের পর কার্তিক মাসেই সরিষা বুনেছেন তারা ইতিমধ্যে সরিষা মাড়াইও করেছেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব খাপড়িখাল এলাকার মধু মিয়া চারবিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সরিষা উত্তোলন করছিলেন তিনি। মধু মিয়া জানান, সরিষা আবাদে খরচ কম, লাভ বেশি। প্রতিবিঘায় বীজ, সার, সেচসহ তার খরচ হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। বিঘায় ৬ মণ সরিষা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। খলেয়া ইউনিয়নের চন্দনেরহাট এলাকার কৃষক এমদাদুল হক জানান, মাড়াই করার পর তিনি বিঘায় ৫ মণ সরিষা পেয়েছেন। বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ সরিষা দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। সরিষা চাষিরা জানান, এ অঞ্চলে আলু উত্তোলনের পরই বোরো চাষ করা হয়। বোরোতে খরচ অনেক বেশি। আলু বিক্রির টাকা দিয়েই বোরো চাষ করতে হয়। কিন্তু গত দু’বছরে আলুতে লোকসান হওয়ায় বেকায়দায় পড়তে হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এ বছর সরিষাই তাদের সম্বল বলে জানান তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্রমান্বয়ে এ অঞ্চলে সরিষার আবাদ বাড়ছে। এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় বিগত বছরগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। গত বছর তা বেড়ে আবাদ হয়েছে ৩৮ হাজার ৪৩৩ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর আবাদ হয়েছে ৩৯ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে রয়েছে রংপুরে সাত হাজার ৭০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১০ হাজার ১১৫ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ১৩ হাজার ৯৮০ হেক্টর, লালমনিরহাটে এক হাজার ৯৪০ হেক্টর এবং নীলফামারীতে পাঁচ হাজার ৫৫৫ হেক্টর। গড়ে প্রতি হেক্টর জমিতে ১ দশমিক ৩৮ মেট্রিক টন সরিষার ফলন হয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
রংপুরে এর আগে ব্যাপকভাবে সরিষা চাষ হতো না উল্লেখ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, গত ক’বছরে এ অঞ্চলে আলুসহ অন্যান্য শাকসবজি চাষে লোকসান হওয়ায় বিকল্প ফসল হিসেবে সরিষার আবাদ বাড়ছে। এ বছর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় চলতি বছর ৩৯ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সরিষা উৎপাদনে কম খরচের পাশাপাশি সারা বছর তা সংরক্ষণ করা যায়। দামও বেশি। আগামীতে সরিষা চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আনন্দবাজার/এম.আর









