কর্মকতাদের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবতে বসেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বগুড়ার বাসডিপোর যাত্রীসেবার মান। ইতোমধ্যেই বন্ধ রাখা হয়েছে তিনটি রুটের বাসচলাচল। শুধু তাই নয় লক্কর ঝক্কোর বাসগুলি পথিমধ্যে প্রায়ই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এতে সরকারি এই সেবা সংস্থার কাছে মানুষ সেবাতো পাচ্ছেনই না বরং ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ থেকে পরিত্রাণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজশাহী বিভাগীয় বিআরটিসি বাসডিপো বগুড়ায় বর্তমানে ১১টি রুটে ২২টি বাসচলাচল করছে। প্রতিদিন এসব বাস থেকে লিজের মাধ্যমে যে রাজস্ব জমা হয় এর চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ইচ্ছেমতো তিনটি রুটে বাস বন্ধ রাখা হয়েছে। কখনও যাত্রী কম হলে বাসের লিজ গ্রহীতারা বাস বন্ধ রাখছেন। এতে যাত্রি সেবার মান তলানীতে নেমে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোপালগঞ্জ থেকে ভুরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম থেকে পিরোজপুর এবং পঞ্চগড় থেকে পটুয়াখালী রুটে দিনে রাতে মিলে ৮টি বাস আগে চলাচল করতো। এখন তেলের দাম বাড়ার কারণে লোকসান হবে এমন অজুহাতে গত দশদিন ধরে এসব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হযেছে। এতে প্রতিদিন তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা করে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। যাত্রীদের যারা আগে বিআরটিসি বাসে এসব রুটে চলাচল করতেন তারা বিকল্প উপায় খুঁজে নিচ্ছেন।
সরেজমিনে বগুড়া ডিপোতে গিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ বাসই লক্কর ঝক্কর অবস্থায়। বর্ষকালে বাসের ভেতরে পানি পড়ায় যাত্রীদের ভিজতে হয়। সিটগুলিতে ভালো কভার বা ফোম নেই। বাসের যন্ত্রপাতি এতই পুরোনো হযে পড়েছে যে প্রায়ই রাস্তার মধ্যে বিকল হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বগুড়া থেকে জয়পুরহাট এবং নওগাঁরুটে চলাচলকারী বাসগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। প্রায়ই বিকল হয়ে রাস্তার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সরকারি অফিসগামী যাত্রীরা সপ্তাহের চারদিনই সঠিক সময়ে অফিসে পৌছাতে পারছেন না। সব সময়ই দুর্ঘটনার শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে।
বগুড়া থেকে প্রতিদিন বিআরটিসি বাসে করে জয়পুরহাটে গিয়ে অফিস করেন ইমতিয়াজ হোসেন নামের একজন চাকরিজীবি। তিনি জানান, নানা ঝক্কি-ঝামেলা নিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে। ভাড়া ঠিকই নিচ্ছে তবে যাত্রী সেবার মান একেবারেই নেই। চালক কিংবা সহকারী অনেক সময় বাস চালাতে অনীহা প্রকাশ করলে তাদের চাকরি হারানোর হুমকিতে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে তারা ফিটনেসবিহীন বাস চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
বগুড়া ডিপো থেকে সকাল পৌনে আটটায় জয়পুরহাট যাওয়ার পথে সরকারি চাকরিজীবি কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিআরটিসি বাসে সঠিক সময়ে পৌঁছানো যাবে এমন আশা নিয়ে তারা বাসে উঠেন। তবে সপ্তাহে দু’একদিন বাদে প্রায়দিনই তাদের বিলম্বে অফিসে পৌঁছিতে হয়। পথিমধ্যে বাস বিকল হওয়াতে প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
নওগাঁ রুটে বাস লিজ গ্রহীতা শাহ আলম জেবু জানান, তারা প্রতিদিন ঠিকমতো সরকারি নির্ধারিত রাজস্ব জমা করছেন কিন্তু যাত্রীসেবার মান ঠিক রাখতে পাড়ছেন না। ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরাতন বাসগুলির একটিরও ফিটনেস নেই। তবুও সরকারি বাস হিসেবে এসব রাস্তায় চলছে। মাঝে মধ্যেই যন্ত্রাংশ ভেঙে রাস্তায় পড়ে থাকছে। এসবের কোনো তোয়াক্কা করছে না ডিপো কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদ করায় ২ মাস ধরে বাস মেরামত করার নামে বন্ধ রেখে ছিলাম। আবার উপরি টাকা না দিলে নানা অজুহাতে তাদের লিজ বাতিল করার হুমকিও পেয়েছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিপোর স্টাফরা বলেন, বাস মেরামত এবং কেনাকাটায় নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বাস ডিপোর ম্যানেজারের বিরুদ্ধে। বাসগুলিতে যেসব টায়ার লাগানো রয়েছে তা অতিনিম্নমানের। পুরাতন টায়ারকে রোভারিং করে বাসে লাগানো হয়। তাবে বিল ভাউচারে নতুন ক্রয় উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে ডবল টাকা তোলা হয়েছে। তারা আরও জানান, নষ্ট হওয়া গাড়িগুলি থেকে পুরাতন পার্টস খুলে অন্য বাসে লাগিয়ে নতুনের টাকা তোলার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে এক মাসে ৭ জন স্টাফকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন আবার ম্যানেজ করে থেকে গেছেন।
বাস বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে কয়েকজন স্টাফ তেলের দাম বাড়ানো আর যাত্রীর সংকটের পাশাপাশি অব্যবস্থাপনাকেও দায়ি করেন। তারা বলেন, বাসগুলো নষ্ট হলে মেরামত করতে দীর্ঘ সময় নেয়া হয়। এক ঘণ্টার কাজ করতে লেগে যায় ৬/৭ দিন। ফলে ঐসব রুটের বাসগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকে।
স্টাফরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাস বন্ধ থাকলে তাদের আয়ও বন্ধ থাকে। সংসার চালাতে বিপাকে পড়তে হয়। লিজ নেয়া কয়েকজন গাড়ির মালিক তেলের দাম বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও তারা মূলত দুষলেন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অব্যবস্থাপনা আর স্বেচ্ছাচারিতাকে। তারা বলেন, কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে বাস মেরামত করে দিলে তারা যাত্রীদের সঠিক সময়ে সেবা দিতে পারতেন। তাতে যাত্রী দুর্ভোগ বন্ধের পাশাপাশি সরকারের খাতে রাজস্ব দিতে পারতেন। রুটগুলোতে নিয়ম মাফিক সেবা দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সদয় হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন লিজ গ্রহীতারা।
অব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে বগুড়া ডিপোতে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ট্রাফিক পরিদর্শক নাদিম বলেন, বছর খানেক আগে পদে যোগদান করেছি। এখনও দায়িত্ব বুঝে পাইনি।
সব অভিযোগ অব্যবস্থাপনা বিষয়ে জানতে চাইলে ডিপোর ম্যানেজার ডিজিএম মনিরুজ্জামান বাবু বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে মালিকদের বেশি টাকা জমা দেয়ার পাশাপাশি যাত্রী সংকটের কারণে বাসগুলো বন্ধ রেখেছে লীজকৃত মালিকরা। বাসগুলো মেরামতে দীর্ঘসূত্রতা বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান মালিকপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, কথা তাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমরা সব বাসগুলোকেই নিয়মাতান্ত্রিকভাবে সেবা দিয়ে আসছি। ট্রাফিক ইন্সপেক্টরকে দায়িত্ব বুঝে না দেয়া বিষয়ে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।









