পুলিশ-ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতা মানেনি মাঝি ও যাত্রীরা
- অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে নৌকাডুবি: তদন্ত কমিটি
- ৬০ জনের ধারণক্ষমতায় ছিলেন ‘দেড় শতাধিক’
নৌকাডুবে মৃত্যুর মিছিল
মাস দেড়েক আগেই সাত পাক ঘুরে হাতে হাত রেখে পথচলা শুরু করেছিলেন নব-দম্পতি হিমালয় ও বন্যা। সামনে দুর্গাপূজা ঘিরে বুনছিলেন নানা রঙিন স্বপ্ন। ইচ্ছে ছিল করতোয়ার ওপারে মহালয়া দেখে ফেরার পথে পূজার কেনাকাটা সেরে ফেলবেন। তবে সীমাহীন স্বপ্ন আর অন্যরকম আনন্দ বুকে চেপে যে নৌকায় করে করতোয়া নদী পার হয়ে চেয়েছিলেন সেই নৌকাডুবে সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। ডুবে গিয়ে হিমালয় আর বন্যার হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে পরনের কাপড় খুলে নববধূ বন্যা প্রাণে বাঁচলেও তলিয়ে গেছেন হিমালয়। ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ তিনি।
স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বন্যা গত চারদিন ধরে স্তব্ধ। বার বার ছুটে যাচ্ছেন নদীর তীরে। যদি এসে হাত ধরেন হিমালয়। শুধু বন্যাই নয়, ঘটনার দিন থেকে হিমালয়ের সন্ধানে নদীর তীরে অপেক্ষা করছেন তার দুলাভাই গ্রী বাবু। তবে অপেক্ষার প্রহর শুধুই দীর্ঘ হচ্ছে। জীবিত কিংবা মৃত কোনো অবস্থাতেই পাওয়া যাচ্ছে না হিমালয়কে। গ্রী বাবু গণমাধ্যমে বলছেন, ওইদিন থেকে অপেক্ষা করছি কোনো খোঁজ নাই। হিমালয়ের মরদেহটাও পাবো কি-না জানি না। বন্যার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। বেচারি বাড়িতে বার বার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান ফিরলেই বলছে হিমালয়কে একবার দেখান, একবার দেখান। বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করছে জীবিত না হোক মৃত হলেও অন্তত মরদেহটা নিয়ে ফিরবো আমি।
শুধু হিমালয়ই নয়, ভয়াবহ সেই নৌডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন অর্ধশতকের বেশি মানুষ। নিকট অতীতে পঞ্চগড়ে করতোয়া নদীতে নৌকাডুবে এত বেশি প্রাণহানি আর কোনো নৌডুবিতে ঘটেনি। এ ঘটনায় গোটা জেলাতেই শোকের বন্যা বইছে। কেউ স্বজনের মরদেহের পাশে বসে কাঁদছেন, আবার কেউ নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানের প্রহর গুনছেন। নৌকাডুবির মর্মান্তিক সেই ঘটনায় শুধু পঞ্চগড়ই নয়, গোটা দেশেই আলোচনা সমালোচনা চলছে ঘটনা নিয়ে।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছর মহালয়া উপলক্ষে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার আউলিয়া ঘাট থেকে বদেশ্বরী ঘাটে যান সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষরা। দিনটিতে দুই ঘাটে মানুষের উপস্থিতি থাকে প্রচুর। ব্রিজ না থাকায় এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে যাওয়ার মাধ্যম হলো একমাত্র নৌকা। তবে অসতর্কতা ও বিশৃঙ্খলা রোধে ঘাটে এই সময়ে টহল দেয় থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঘটনার দিন দুপুরে আউলিয়া ঘাটে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সতর্ক থাকলেও ঘটনা ঘটেই যায়। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা বলছেন, যাত্রী আর মাঝিদের বার বার সতর্ক করলেও তারা কেউই সতর্কবার্তা আমলে নেয়নি।
পুলিশ আর ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে আউলিয়া ঘাট থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উল্টে যায় নৌকাটি। এতে গত তিন দিনে ৬৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন। পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে অধিক যাত্রী নিয়ে নৌকার যাত্রা প্রসঙ্গে বোদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজয় কুমার রায় বলেন, একটা ছোট ভিডিও আমাদের কাছে রয়েছে। নৌকা ঘাটে আসা মাত্রই হুমড়ি খেয়ে সকলে উঠতে থাকে। আমাদের পুলিশ সদস্যরা হ্যান্ডমাইকে অধিক যাত্রী যাতে না ওঠে তার জন্য সতর্ক করছিলেন। তারা কেউ সতর্কতা মানেননি। আর সতর্কতা অবলম্বন না করায় আজ এমন দিন দেখতে হলো।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দুর্ঘটনার শিকার নৌকার ধারণক্ষমতা ছিল ৪০-৫০ জন যাত্রী। অথচ সেই নৌকাতে যাত্রী ছিল শতাধিক যাত্রী। বেশি যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করার কারণে যাত্রার পর থেকেই পানি উঠতে শুরু করে। ৫০০ গজ যেতেই উল্টে ডুবে যায়। নৌকাডুবির পর সাঁতরে বেঁচে আসা কুসুম ও যশোবালা নামে দুই যাত্রীর ভাষ্য, নৌকায় অনেক লোক ছিল। ঘাটে ভিড়তেই লোকজন হুমড়ি খেয়ে উঠতে থাকে। পুলিশ বেশি মানুষ উঠতে নিষেধ করলেও কথা শোনেনি কেউ। নৌকায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অল্প করে পানি ওঠা শুরু করে। তারপর ডুবে যায়। আমরা সাঁতার জানতাম বলে এ যাত্রায় বেঁচে ফিরেছি। অনেকে সাঁতার জানায় তীরে আসতে পারলেও সাঁতার না জানা নারী ও শিশুরা ডুবে যান। অনেকেই ধারণা করছেন, স্রোতের কারণে অনেক মরদেহ পানিতে ভেসে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, করতোয়া নদীর অপর পাড়ে বদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। সেই ধর্মসভায় যোগ দিতেই ঘটনার সময় নদী পার হতে সনাতন ধর্মালম্বীরা নৌকায় উঠেছিলেন। তবে ৫০-৬০ জনের ধারণ ক্ষমতার নৌকাটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিলেন। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নদীর মাঝপথে নৌকাটি ডুবে যায়। অনেকে সাঁতার জানায় তীরে আসতে পারলেও সাঁতার না জানা নারী ও শিশুরা ডুবে যান। ধারণা করা হচ্ছে, স্রোতের কারণে অনেক মরদেহ পানিতে ভেসে গেছে।
নৌকাডুবি থেকে বেঁচে যাওয়া মাড়েয়া বামনপাড়া এলাকার সুবাস চন্দ্র রায় বলেছেন, আমিও নৌকায় ছিলাম। নৌকায় দেড়শরও বেশি যাত্রী ছিল। আমরা ওঠার পরপরই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। এ সময় মানুষজন নৌকার মধ্যেই হুড়োহুড়ি শুরু করে। পরে যে পাশেই যাচ্ছিলাম, সেপাশেই পানি ঢুকছিল। আমরা পাঁচজন বন্ধু ছিলাম। কোনোমতে সাঁতার কেটে প্রাণে বেঁচে যাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্য যাত্রীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার আকুতি করছিল। কিন্তু চরম মুহূর্তের বর্ণনা করতে পারবো না। এত মানুষ মারা যাবে, বুঝতে পারিনি।’
নৌকাডুবির ঘটনায় একসঙ্গে পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন ষাটোর্ধ্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা মঙ্গলু চন্দ্র রায়। তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বড় ছেলে হরি কিশোর রায়। সংসারের খুঁটিনাটি থেকে বড় আয়োজন সব দেখতেন তিনি। তবে আউলিয়া ঘাটে নৌকাডুবির ঘটনায় সেই ছেলেসহ মেয়ে পারুল রানী, পুত্রবধূ কনিকা ও ছেলের শ্যালিকা মনিকা ও বিয়াই সরেন রায়কে হারিয়ে মঙ্গলু দুচোখে অন্ধকার দেখছেন।
মঙ্গলু সরেন বলেন, ‘আজ বদেশ্বরী মহালয়া যাইতে কালে আমার বউ-ছোয়াল, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হারাইলাম। দুঃখ থুবার জায়গা নাই। আমি তিনজন হারাইছি আমার পরিবারের আমার মেয়ে, বড় ছেলে, ছেলের বউ গেইছে। আমার প্রদীপটা শ্যাষ হয়া গেইছে। আমার যে একটা বংশের প্রদীপ। সেটা শ্যাষ হয়া গেইছে। এখন আমার সংসার কায় দেখবে?’
অসচেতনতা আর অসতর্কতাকেই দায়ি করছেন মঙ্গলু চন্দ্র রায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, ওতোগুলা সাংবাদিক ছিলেন ওইখানে কী করলেন। আজ বক্তব্য নিতে আসছেন। ফায়ার সার্ভিস ছিল। তিনদিন হয় মরদেহটা আমাক দিতে পারলো না ওঠেয়া। অথচ পাবলিক তুলে দিল। আমি নিজেও সেন্সলেস। এতো দুঃখ বেদনা দেওয়ার পর এর চেয়ে আমি কী বলবো।’
নৌকাডুবির ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন গঠিত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দীপঙ্কর রায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর কথা বলেছেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপেই নৌকাডুবির ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে সব ভিডিও ডকুমেন্টস সংগ্রহ করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। নদীর দুই পাড়ের মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে এ ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর রায় আরও বলেছেন, তিনিসহ কমিটির অন্য সদস্যরা উদ্ধার কার্যক্রম মনিটরিং, উদ্ধার হওয়া মৃত ব্যক্তিদের মরদেহ হস্তান্তর ও সৎকারে সহায়তাসহ বিভিন্ন তদারকি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কারণে তদন্ত কার্যক্রমে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত আরও তিন দিন সময়ের আবেদন করলে পঞ্চগড় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম আবেদন মঞ্জুর করেন।









