- যাচ্ছে চীন জাপান, ইতালি, সিঙ্গাপুর
- বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের হাতছানি
- স্বাবলম্বী ২০ হাজার কৃষক পরিবার
উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে হোগলা চাষ করে ভাগ্য বদলেছে ২০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবারের। এখানকার হোগলা পাতা দিয়ে তৈরি পণ্যসামগ্রী দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। যদিও সরকারিভাবে চাষিদের হোগলা পাতা চাষাবাদে কিংবা এ পাতা দিয়ে তৈরি পণ্যসামগ্রী বিদেশে রপ্তানির বিষয়ে কোনো সহায়তা দেওয়া হয় না। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষি বিভাগের কোনো সহযোগিতাও নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এখাতে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজলোর কালাদরাপ, চরমটুয়া ও এওজবালিয়া ইউনিয়নে সড়ককের দু’পাশে হোগলা পাতার ক্ষেত। যতদুর চোখযায় জমিগুলোতে কাঁচা হোগলা পাতা দেখা যায়। ক্ষেত ঘেঁষে গড়ে উঠা বাড়িগুলোতে দেখা যায় শুকনো হোগলা পাতার ব্যান্ডিল। স্থানীয়দের মতে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত ২০ হাজার পরিবারের জীবন জীবিকা এ হোগলা পাতার ওপর নির্ভরশীল। আর হোগলা পাতা দিয়ে চাটাই (বিছানা) ও রশি তৈরিতে কাজ করেন এ অঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক নারী। এটি গ্রামীণ শিল্পের একটি ঐতিহ্য। নারীদের হাত দিয়ে তৈরি কোটি টাকার হোগলা পাতার চাটাই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুরসহ প্রতিদিন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
স্থানীয়দের কাছে হোগলা পাতার চাষবাদ এখন একটা শিল্পে পরিণত হয়েছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে হোগলা পাতার তৈরি উচ্চমানের হস্তশিল্প ও আসবাপত্র যাচ্ছে চীন, জাপান, ইতালি, সিঙ্গাপুর, কানাডাসহ বাইরের অন্যান্য দেশে। যা দেশের গ্রামীণ শিল্পকে বিদেশে উপস্থাপন করছে। এ শিল্পটিকে ঘিরে রয়েছে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা। এ থেকে পরিবেশ সম্মত পণ্য উৎপাদন হয় বিধায় চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। ছোটো বিছানা, নামাজের মাদুর, কুশন, ঝুড়ি, টুপি, ছোট ব্যাগ, টুকরি, ঘরের নানা ধরণের ওয়লম্যাট, হাতপাখা ইত্যাদি তৈরি হয়। তবে প্রচারের অভাবে এটি তেমন বিকাশ লাভ করতে পারছে না। যার প্রমাণমিলে জেলা কৃষি অধিদপ্তর ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্প দপ্তরে যোগাযোগ করে, তাদের কাছে নেই এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান। আবার কেউ জানেই না হোগলার বিষয়ে।
হোগলা তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ। পলিমাটিতে জন্ম নেওয়া এ গাছটির উচ্চতা ৫ থেকে ১১ ফুট হয়ে থাকে। পলিমাটি সমৃদ্ধ এ এলাকাগুলোতে প্রচুর পরিমানে উৎপন্ন হয় হোগলা পাতার। শুরুতে একবার বীজ ফেললে আর কখনও বীজ ফেলার প্রয়োজন হয় না। প্রতি মৌসুমে ৩ চাষে হোগলা পাতা তোলা যায় দুইবার। কাটার পর পরবর্তী সময়ে সাধারণত নিচু জমিতে এ পাতা জন্মে থাকে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এ অঞ্চলে হোগলার চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। হোগলা দিয়ে এ অঞ্চলের নারীরা সাধারণত চাটাই, রশি তৈরি করে থাকে। পাতা তৈরি চাটাই নরম ও আরমাদায়ক হওয়ায় স্থানীয়দের ভাষায় একে গরীবের বিছানাও বলা হয়। মানুষের বাড়ির বিছানার কাজ ছাড়াও এ চাটাইগুলো মসজিদ মাদ্রাসা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। শতভাগ পরিবেশ সম্মত হওয়ায় গ্রামের ঘর তৈরি, ঘরের ছাউনি, বেড়া, টুকরি, তাজা ফল বা সবজি পরিবহেনর জন্য এ চাটাই দিয়ে মুড়িয়ে নেওয়া হয়।
সরেজমিনে জানা যায়, প্রায় দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার পরিবার হোগলা পাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক হাজার একর জমিতে হোগলার উৎপাদন হয়। চাষিদের তথ্যমতে, প্রতিএকর জমিতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার হোগলা পাতা উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতিমৌসুমে এ অঞ্চলে ১২ কোটি টাকার হোগলা উৎপন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে হোগলা পাতা ও পাতার তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা বাড়ায় চাষে স্থানীয়দের আগ্রহ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি মৌসুমে বাড়ছে জমির সংখ্যা।
কয়েকজন চাষী জানান, প্রতি মৌসুমের অগ্রায়হণ ও বৈশাখ মাসে কাটা হয় পাতাটি। বৈশাখ মাসের প্রথম ধাপে কাটার সময় পাতাগুলোর উচ্চতা ৮ থেকে ১১ ফুট পর্যন্ত হয়। তবে দ্বিতীয় দফায় অগ্রায়হণে পাতার উচ্চতা হয় ৫ থেকে ৭ ফুট। প্রতিএকর হিসেবে স্থানীয় পাইকার (আড়ৎদার) কাছে বিক্রি করা হয় হোগলা ক্ষেত। পরে তারা শ্রমিকের মাধ্যমে পাতা কেটে বিভিন্ন বাড়িতে থাকা তাদের লোকজনকে পৌঁছে দেয়। পরে ওই পাতাগুলো ৭ থেকে ৮ দিন রোদে শুকানোর পর চাটাই ও দড়ি তৈরির উপযোগি করে তোলে। এরই মধ্যে পাইকারদের কাছ থেকে পাতা ক্রয় করে নেন অনেকেই। পাতা বাছাই করে একটা অংশ চাটাই ও একটা অংশ দড়ির জন্য আলাদা করা হয়। দড়িগুলোর এক তৃতীয়াংশ যায় ঢাকার বিভিন্ন কারখানায়। সেখান থেকে লোহা এবং বেতের তৈরি চেয়ার, টেবিল ও সোপায় বিভিন্ন ডিজাইনে মুড়িয়ে তা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও বিদেশের বাজারের জন্য হোগলা পাতা দিয়ে উচ্চমানের হস্তশিল্প তৈরী করে ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশে রপ্তানি করছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় চাষী আব্দুল গোফরান ও তাজুল ইসলাম জানান, হোগলা পাতা চাষে একর প্রতি খরচ হয় প্রায় ৩৯০০টাকা। প্রতি মৌসুমে ৬২০০ টাকা খরচ করে বেপারীদের কাঝে পাতা বিক্রি করেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার। পাতা কাটাসহ যাবতীয় খচর বেপারী বহন করে। কৃষি অধিদপ্তর থেকে কোনো প্রকার সহযোগিতা পাননা বলে অভিযোগ করে তারা সরকারের পক্ষ থেকে সার ও কীটনাশক সহায়তা দাবি করেন।
স্থানীয়রা জানান, হোগলা গাছ থেকে ফল পাওয়া যায়। যা অনেক পুষ্টিকর। প্রতি একর জমিতে ১ থেকে ৪ কেজি ফল পাওয়া যায়। যা সাধারণত চাষিরা নিজেদের পরিবারে ব্যবহার করে থাকে। এর বাইরে প্রতিকেজি হোগল ফলের মূল্য ৪৫০টাকা।
রব মার্কেটের আবু জাকের বেপারি বলেন, তাঁর দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি খলিফারহাট ও অপরটি রব মার্কেটে। দুটি প্রতিষ্ঠানে হোগলা পাতায় তৈরি চাটাই বিক্রি করেন তিনি। মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার চাটাই ক্রয় বিক্রয় করে ২ লাখ টাকা লাভ হয়। এ লাভের টাকায় তাঁর সংসার চলে। এ ব্যবসার ওপর তার জীবন জীবিকা নির্ভর বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ কালাদরাপের সবুজ বেপারি জানান, এলাকায় তিনিসহ ৭ জন বেপারি আছেন যারা শুধুমাত্র হোগলা পাতার দড়ি ক্রয় করেন। এছাড়া পাতার চাটাই ক্রয় করেন আরও অর্ধশতাধিক বেপারি। প্রতি মৌসুমে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি টাকার দড়ি ক্রয় করেন তিনি। তাঁর অধিনে প্রায় ১৫০০ লোক কাজ করেন। প্রতি একর জমি থেকে তোলা পাতা দিয়ে ২৫০ ব্যান্ডিল দড়ি তৈরি হয়। পাতা ক্রয়ের পর প্রতি ব্যান্ডিল দড়ি প্রস্তুত করতে খরচ হয় ৫০টাকা করে। দড়ি বিক্রি করে সবকিছু বাদ দিয়ে দেড় থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয় করেন।
নোয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশরেকুল হাসান জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে হোগলা পাতার ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। কৃষি অধিদপ্তর থেকে হোগলার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ না থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। কৃষকদের হোগলা চাষ সম্পর্কে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প নোয়াখালীর উপ মহাব্যবস্থাপক মাহবুব উল্যাহ জানান, হোগলা পাতায় তৈরি ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খোঁজ খবর নিয়ে একটি তালিকা করা হবে। এছাড়াও এ শিল্পেজড়িত সকলকে সরকারি রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হবে। পরবর্তীতে তারা সরকারি প্রনোদনাসহ সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা পাবে।
আনন্দবাজার/এম.আর









