কক্সবাজারে মানবপাচার চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পাচার করা হচ্ছে পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুদেরও। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে মাঠে সক্রিয় বেশ কয়েকটি চক্র। আকাশপথ পাচারের নিরাপদ রুট হলেও শীত মৌসুমে চক্রের প্রধান টার্গেট সাগরপথ। যদিও বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর প্রাণ হারায় বহু মানুষ। কিন্তু এসব ঘটনায় যেহারে মামলা হয় সেহারে নিষ্পত্তি হয় না। তাছাড়া বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকৃত ঘটনা যেমন ধামাচাপা পড়ছে তেমনি আসামিরা নানাভাবে মামলা থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। এমনটাই মনে করছেন মামলাসংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। ফলে শাস্তির আওতায় আসছে খুবই কম অপরাধী।
সূত্রমতে, কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সাগরপথ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আদমপাচার কাজে জড়িত রয়েছে রোহিঙ্গাসহ দুই শতাধিক স্থানীয় ও বহিরাগত দালাল। উপকূলীয় এলাকায় নিয়োজিত আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যের চোঁখ ফাঁকি দিয়ে দালালরা দেশের বিভিন্ন এলাকার সহজ সরল লোকজনকে মালয়েশিয়ায় সোনার হরিণ ধরার প্রলোভন দেখিয়ে উপকূলে জড়ো করে মানবপাচার অব্যাহত রেখেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু কিছু মালয়েশিয়াগামীকে আটক করলেও রহস্যজনক কারণে মূল হোতারা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া পুলিশের হাতে আটক হওয়া মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা না করে ছেড়ে দেওয়ায় এবং চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় মানবপাচার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এক বছরে দালালচক্রের সদস্যরা উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়াসহ কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫ হাজার মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া পাচার করেছে। তার মধ্যে দুই শতাধিক মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৈধভাবে একজনকে মালয়েশিয়া যেতে কমপক্ষে ৩ লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে হয়। তবে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে সাগরপথে অল্প টাকায় যাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। পরে যাত্রীরা মালয়েশিয়া পৌঁছলে বন্দিশালায় তাদের আটকে রেখে স্বজনদের কাছ থেকে দালালরা আদায় করছে লক্ষ লক্ষ টাকা। এসব উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র সৈকত সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সাথে সংযুক্ত থাকায় মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের নিরাপদ রুট হিসাবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। বিশেষ করে উখিয়ার ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক একাধিক দালাল চক্র মালয়েশিয়া মানবপাচারের সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কক্সবাজারে বর্তমানে সাগরপথে ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া যাবার প্রবণতা কমলেও অন্যান্য জেলা ও রোহিঙ্গারা দালালের হাত ধরে মালেশিয়া যেতে মরিয়া। গত কয়েক মাসের মধ্যে সাগরপথে ট্রলারে চেপে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের উদ্ধার করেছে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে তথ্য নিয়ে জানা যায়, সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের মধ্যে সুন্দরী নারীর সংখ্যা বেশি। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবকদের সঙ্গে বিয়ে দিতে দালালরা সুন্দরী নারীদের টার্গেট করে বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে সেদেশে পাচার করছে। এছাড়া অনেক বিবাহিত নারীও তাদের শিশু সন্তানসহ সেখানে স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য দালালদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে।
এদিকে, গত মাসের শুরুর দিকে স্থানীয় মহেশখালী থেকে মালয়েশিয়া যাওয়া কথা বলে ১০ কিশোর ও যুবককে নিয়ে যায় মানবপাচারকারী চক্র। যাত্রাপথে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়লে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা-বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হয়েছেন। বর্তমানে তারা মংড়ুর কারাগারে আটক রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের দ্বারস্থ হয়েছেন তারা।
মংডুর কারাগারে আটকদের আত্মীয় ছৈয়দ কবির বলেন, বেশি আয়ের লোভ দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের এলাকার ১০ যুবক ও কিশোরকে নিয়ে যায় দালালচক্র। পাচার করতে গিয়ে মিয়ানমারের সীমানা থেকে সে দেশের জলসীমায় নৌ-পুলিশ তাদের নিয়ে গেছে। বহুদিন পর্যন্ত ১০ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিছুদিন আগে টেকনাফের কিছু জেলের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন ওই ১০ জন মিয়ানমারে আটক আছে।
উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গা নারী সানজিদা বেগম বলেন, মালয়েশিয়ায় আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। দুই পরিবার মিলে আমাকে স্বামীর কাছে পাঠানোর জন্য ট্রলারে তুলে দিয়েছে। আমাকে বলা হয়েছিল জাহাজে করে নেয়া হবে, কিন্তু এখানে এসে দেখি ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের ট্রলারে করে পাঠানো হচ্ছে।
উখিয়ার তাজনিমার খোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল নবী বলেন, আগে স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় অনেক রোহিঙ্গা পাসপোর্ট তৈরি করে বাংলাদেশি সেজে আকাশপথে মালয়েশিয়াসহ মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি রোহিঙ্গারা যেন কোনো পাসপোর্ট করতে না পারে সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি রয়েছে। ফলে অবৈধভাবে সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া যেতে রাজি হচ্ছে তারা। আবদুল নবী আরও বলেন, প্রতিটি ক্যাম্পে মালয়েশিয়া পাচারকারী দালাল চক্রের সদস্যরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দালালরা প্রথমে কম টাকার বিনিময়ে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার কথা বললেও পরে মাঝপথে গিয়ে স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর আগে হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের টাকা। এই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে দালালরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের পথ বেছে নেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে আইনে দেশের সাত বিভাগে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা থাকলেও তা কার্যকর না হওয়ায় এসব চক্রকে নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রাপ্ত তথমতে, এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক দালালের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় ১২৫টি মামলা হয়েছে। চলতি বছরের ১০ মাসে শুধু টেকনাফ উপকূল থেকেই ২৮ দালালকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হালিম বলেন, চলতি মাসেও ৪ জন মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়াগামী বোটডুবির ঘটনায় ২৪ জনকে এজাহারনামীয় মামলা রুজু ও ছয় দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জড়িত অন্যান্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান বলেন, মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, অর্থ ব্যয় এবং পাচারকারী সিন্ডিকেট অনেক সংঘবদ্ধ হওয়ায় ভুক্তভোগীরা শেষ পর্যন্ত মামলা চালাতে পারেন না। যার কারণে একটা সময় তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে মানব পাচার নিয়ে কাজ করা এক এনজিও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মানবপাচার আইনে তদন্ত, শাস্তিসহ বেশ কিছু বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও সাত বিভাগে সাতটি ট্রাইবুন্যাল গঠনের কথা ছিল। কিন্ত এত বছরে কোথাও ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়া দুঃখজনক। তিনি বলেন, যেসব জেলায় মামলা জট বেশি সেখানে দ্রুততর সময়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে পাচার মামলার বিচার শুরু করলে এ সঙ্কট থেকে মুক্তি সম্ভব হবে। অন্যথায় অপরাধীরা আরও সুযোগ পাবে এবং বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, মানবপাচার ও ইয়াবা পাচার চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি রাখা হয়। এছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে কারো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। বিশেষ করে, মহেশখালী,কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফের সম্ভাব্য মানবপাচার স্পটসমূহে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও কোস্টগার্ড সক্রিয় রয়েছে মানবপাচার ঠেকাতে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী (১৪) আর্মড পুলিশ ব্যাটলিয়ানের অধিনায়ক সৈয়দ হারুনর রশীদ জানান, ক্যাম্পে মাঝেমধ্যে মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠে। যখনই পাচারচক্রকে সনাক্ত করতে সক্ষম হই তখনই তাদের ধরে থানায় সোপর্দ করি।









