যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেশের অন্যান্য জেলা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলা। এই জেলা থেকে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা সড়কপথ। এখানে নেই ট্রেন, বিমান কিংবা নৌযান যোগাযোগ। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর চালু হয় লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকা লঞ্চ সার্ভিস।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরী ঘাটে যাত্রা শুরু হয় ঢাকা-লক্ষ্মীপুর যাত্রীবাহী লঞ্চ সার্ভিস। এদিন সকাল ৭টায় ৫০ যাত্রী নিয়ে প্রিন্স অব রাসেল-৩ নামের লঞ্চটি লক্ষ্মীপুর থেকে ছেড়ে আসে। লঞ্চটি উদ্বোধন করেন বিআইডব্লিউটিএ নৌ ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম। এতে আশার আলো দেখতে পায় জেলাবাসী। তবে লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকা সদরঘাটে যাওয়ার ৫০ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রিন্স অব রাসেল নামের লঞ্চটি আর ফেরেনি লক্ষ্মীপুরে। বর্তমানে বন্ধ রয়েছে লঞ্চ সার্ভিস।
এ বিষয়ে মজুচৌধুরী ঘাটের ইজারাদার ইসমাইল হোসেন পাঠান বলেন, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়েছিলো। ড্রেজিংয়ের অভাবে নাব্যতাসংকটে লঞ্চটি ঘাটে ভিড়তে পারছিলো না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে আবারও সার্ভিসটি চালুর দাবি জানান তিনি।
প্রিন্স অব রাসেল-৩ এর প্রতিনিধি রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, মালিকপক্ষ লক্ষ্মীপুর-ঢাকা লঞ্চসার্ভিস চালু করার জন্য সময় নির্ধারণ করেছিল। তবে নদী পথে যাতায়াতে সময় বেশি লাগার কারণে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। যে কারণে ঢাকা থেকে আর ফেরেনি লঞ্চটি।
চাঁদপুর লঞ্চঘাটে কয়েকটি লঞ্চের কর্মকর্তারা জানান, সড়কপথে লক্ষ্মীপুর থেকে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে আসতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। আর চাঁদপুর থেকে লঞ্চে ঢাকা যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ ঘণ্টা। সবমিলিয়ে ঢাকা যেতে সময় লাগে ৫ ঘণ্টা। তবে লক্ষ্মীপুর থেকে লঞ্চে ঢাকা যেতে সময় লাগে ৯ ঘণ্টার বেশি। অর্থাৎ সরাসরি লক্ষ্মীপুর থেকে লঞ্চযোগে ঢাকায় যেতে অতিরিক্ত সময় লাগে ৪ ঘণ্টা। সময়ের কথা চিন্তা করে মালিকপক্ষ হয়তো এ রুটে লঞ্চ চলাচলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে।
চাঁদপুর বন্দর কর্মকর্তা কায়সারুল ইসলাম জানান, সময়ের বিষয়ে মানুষ এখন অনেক সচেতন। এখন টাকা দিয়ে মানুষ সময় কিনে। কি কারণে মালিকপক্ষ তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। তা জেনে জানানো হবে।
এদিকে লঞ্চ সার্ভিস চালু হওয়ার পর এমভি প্রিন্স অব রাসেল-৩ এর মালিক জামাল হোসেন জানান, এখন থেকে এমভি প্রিন্স অব রাসেল-৩ প্রতিদিন লক্ষ্মীপুর ঢাকার উদ্দেশে ছাড়বে সকাল ৭টায়। পরে লঞ্চটি প্রতিদিন দুপুর আড়াইটায় ঢাকার সদরঘাট থেকে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসবে। লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকার ভাড়া সাধারণ ৩৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৮০০ টাকা, ডাবল কেবিন এক হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ আবারো ঢাকা-লক্ষ্মীপুর রুটে লঞ্চসার্ভিস চালুর দাবি জানিয়েছেন। শাকচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান টিটু, লঞ্চঘাটের জাবেদ, কামাল, দুলাল মেম্বার ও চররমনী মোহন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ সৈয়াল আবারও ঢাকা-লক্ষ্মীপুর লঞ্চ সার্ভিসটি চালু করা করার দাবী জানান। এতে করে এ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে।
লঞ্চ চাই বাস্তবায়ন পরিষদের আহবায়ক আইনজীবী আব্দুস সাত্তার পালোয়ান বলেন, লক্ষ্মীপুর-ঢাকা লঞ্চ সার্ভিস লক্ষ্মীপুরবাসীর প্রাণের দাবি। দাবি বাস্তবায়নে চালুও হয়েছিলো এ সার্ভিস। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় গেলেও আর ফিরে আসেনি লঞ্চটি। ঠিক কি কারণে ফিরেনি তা বুঝতে পারছি না। লঞ্চটি যেন আবারও লক্ষ্মীপুরে আসে সে ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুর বণিক সমিতির সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সালাউদ্দিন টিপু বলেন, লক্ষ্মীপুর-ঢাকা লঞ্চ সার্ভিস চালু হওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিলো। কিন্তু কি কারণে ছেড়ে যাওয়ার পর লঞ্চটি এখনও ফেরেনি তা আমার জানা নেই।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়া গোলাম ফারুক পিংকু আনন্দবাজারকে বলেন, লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীরহাট হাট থেকে লঞ্চযোগে রাজধানীতে যাতায়াতের দাবি ছিল এ অঞ্চলের ১৬ লাখ মানুষের। প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ লক্ষ্মীপুর এসে নৌ-বন্দর নির্মাণ প্রকল্পসহ বেশ কিছু কাজের উদ্বোধন করে মজুচৌধুরীর হাটকে নৌ-বন্দর উপহার দিয়ে ছিলেন। জেলাবাসীর প্রাণের দাবি লঞ্চ সার্ভিসও চালু হয় লক্ষ্মীপুরে। এতে আশার আলো দেখলেও লঞ্চটি না ফেরায় হতাশা তৈরি হয়েছে মানুষের মাঝে। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি সার্ভিসটি পুনরায় চালু করার।
আনন্দবাজার/শহক









