সারাদেশের মতো হবিগঞ্জেও বাড়ছে মাদকসেবীদের সংখ্যা। দিন দিন মরণ নেশার কবলে পড়ে অন্ধকার জগতে ডুবছে তরুণ প্রজন্ম। মরণপথে পাড়ি জমাচ্ছেন অনেকেই। আবার নেশাগ্রস্ত হয়ে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে চরম হতাশায় রয়েছে অনেক পরিবার। তবে মাদকাসক্তির সমস্যা যতটা ব্যাপক সেই তুলনায় এর সমাধানের জাতীয় উদ্যোগ দেশে একেবারেই ক্ষুদ্র। সারাদেশে যে হারে তরুণ ও তরুণীরা আসক্তির শিকার হচ্ছে, সে হারে তাদের সুস্থ করে তোলার চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
দেশে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও নিরাময়ের জন্য ৪ থেকে ৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার তেজগাঁওয়ে একটি, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে একটি করে চারটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও এতে নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এতে চিকিৎসকসহ অন্যান্য লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। পরিবেশ এমন শোচনীয় যে রোগীদের নিরাময় দূরে থাক বরং জীবাণুঘটিত নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা কত এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
তবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ১৯ হাজার মাদকাসক্ত রোগীর মধ্যে এক জরিপ চালিয়ে দেশে প্রায় ৬০ লাখের বেশি হতে পারে বলে অনুমান করেছেন। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি ১০ জনের একজন চিকিৎসার বিভিন্ন নিরাময় কেন্দ্রের শরণাপন্ন হয়। এ হিসাব থেকে বলা যেতে পারে, এ দেশে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় লাখ মাদকাসক্ত মানুষের চিকিৎসা প্রয়োজন।
কিন্তু সরকারি নিরাময় কেন্দ্র গুলোর খুবই কমসংখ্যক মাদকাসক্তের চিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য আছে। তারা সারা বছরে মোট ১৫ হাজারের মতো রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারে। তবে সেই চিকিৎসার মানও ভালো নয়। তা ছাড়া নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণের পর রোগীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে কিছুদিন কাটাতে হয়। কিন্তু এ পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে স্থান সংকুলান হয় না বলে অধিকাংশ মাদকাসক্ত রোগী বাড়ি চলে যায়। ফলে তাদের সুস্থতার বদলে বাড়তে থাকে অসুস্থতার হার।
মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ দেশের ৪৪টি জেলায় ৩শ ৫১টি বেসরকারি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হবিগঞ্জের গার্নিং পার্কে অবস্থিত নিউস্পন্দন মাদকাশক্তি চিকিৎসা সেবা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্র। মাদকসেবীদের চিকিৎসা সেবায় এক অনন্য ভূমিকা রাখছে এ প্রতিষ্ঠানটি। সমাজ কল্যাণ ও মানবিক এ উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসিত ভূমিকা রাখছে। গত ৩ বছরে এ প্রতিষ্ঠান থেকে ২২১ জন মাদকাসক্ত রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। বর্তমানে এতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরো ১৩ জন রোগি। সম্পূর্ণ অলাভজনক ও প্রতিবছর ভর্তুকির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়।
গত রবিবার বিকেলে সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দেখা যায়, জেলার অত্যাধুনিক মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এটি। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত অত্যন্ত নান্দনিক, উন্নত ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় এখানে। এতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিপ্লব রায় সুজন, পরিচালক আব্দুল মজিদসহ ৩ জন ডাক্তার ও ১০ জন স্টাফ প্রোগ্রামার মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সেবায় দায়িত্ব পালন করছেন। ডা. মো. আমিনুল ইসলাম নিয়মিত, ক্লিনিক্যাল মাইকোলজিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্ট সুমনা ইসলাম প্রতি সপ্তাহে একদিন এবং ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৫ দিন পর পর এ প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দেন। তাছাড়া প্রতিদিন সকাল ১১টায় এবং বিকেল ৩টায় রোগিদের দুটি ক্লাস নেয়া হয়। এতে রাগ-জিদ, নম্র জীবনের বৈশিষ্ট ও হাই রিক্স বিষয়ের ওপর আলোচনা করা হয়। রোগিদের রুটিন অনুযায়ী খাবার পরিবেশন, নিয়মিত ব্যায়াম ও নামাজ পড়ানো হয়।
তুলনামূলক কম খরচে বিশ্বমানের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এখানে। তাই এখন থেকে মাদকাসক্তদের উন্নত চিকিৎসার জন্য আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না বলে জানায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। রোগীদের সুস্থ করে তোলার পরও তাদের খোঁজ খবর রাখা হয়। সামাজিক চলাফেরা, কর্মস্থল ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রোগীর আচরণও পর্যবেক্ষণ করা হয়। কর্মস্থলে যোগদানের আগ পর্যন্ত অতিরিক্ত সেবা, ফ্রি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে ওই প্রতিষ্ঠান।
মাদকাসক্ত রোগি সাইফুল ইসলাম (ছদ্মনাম) জানান, এক সপ্তাহ ধরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি সিরাপ ও ইয়াবা সেবন করতেন। যে কারণে তার সরকারি চাকরি হলেও তিনি নেশার কারণে ট্রেনিং থেকে চলে আসেন। এই কয়েকদিনের তিনি সুস্থতার আভাস পাচ্ছেন বলে জানান।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিপ্লব রায় সুজন জানান, প্রায় ৩ বছর আগে নিউস্পন্দন মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি চালু করা হয়। এখানে ইয়াবা, গাজা, মিকচার (ঝাক্কি) ও পেন্সিডিল সেবনকৃত রোগির সংখ্যা বেশি। প্রতিটি রোগির কাছ থেকে স্বল্প পরিমাণ টাকা নিয়ে ৩ মাসের কোর্সে ভর্তি করেন। ৩ মাসে রোগি সুস্থ না হলে অতিরিক্ত ফ্রি চিকিৎসা দেয়া হয়। তাছাড়া অসহায় দরিদ্রদের পরিবারের রোগিদের সম্পূর্ণ ফ্রি চিকিৎসা দেন তারা। স্থানীয় প্রশাসন সহযোগিতা করলে শিগগিরি ড্যান্ডি আসক্ত পথ শিশুদের চিকিৎসার দেয়ার উদ্যোগ করবেন। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে অসহায় দরিদ্রদের সহযোগিতা, ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য, শহর ও আশপাশ এলাকায় ভবঘুরে থাকা মানুষের চিকিৎসা প্রদান ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়।
এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর হবিগঞ্জের সহকারী পারিচালক একেএম দিদারুল আলম বলেন, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করছে ওই প্রতিষ্ঠানটি। যা খুবই মানবিক ও প্রশংসনীয়। ইতোমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সেবা বাড়ানোর লক্ষে সরকারিভাবে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
আনন্দবাজার/শহক









