- অবৈধ ২২২ লেভেলক্রসিং
সাবধান, এ গেইটে কোনো গেটম্যান নেই, পথচারী ও সকল প্রকার যানবাহন চালক নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন এবং কোনোরূপ দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজেই বাধ্য থাকিবেন
রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত দেশের পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। এতে রেলপথ ১ হাজার ৫৬৮ কিলোমিটার এর মধ্যে ২২২টি অবৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে। বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনায় এসব লেভেলক্রসিংয়ে মারা গেছে অসংখ্য মানুষ। তবে দায় এড়াতে রেল কর্তৃপক্ষ একটি করে নোটিশ ঝুঁলিয়ে দিয়েছে। রেলের সেই নোটিশে বলা হয়েছে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নিতে হবে নিজেকেই।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চল রেলে ১ হাজার ১৯৯টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৭০ জনের। গত দু’দিন আগেও নীলফামারীর দারোয়ানীতে ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশার চার যাত্রী নিহত হন। এর ৪৮ ঘণ্টা আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলিনগরে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয় তিনজনের। এ ছাড়া ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অবৈধ ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ ১২ জন নিহত হয়েছিলেন। রেলের কর্মকর্তারা জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলের পাকশী জোনে খুলনা স্টেশন থেকে টাঙ্গাইল হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পর্যন্ত বৈধ রেলগেট বা লেভেলক্রসিং রয়েছে ৮০৮টি। এসব গেট বা লেভেলক্রসিং স্পেশাল ৪টি গ্রেডে বিভক্ত করা হয়েছে। গ্রেড অনুযায়ী লোকবল রয়েছে সেগুলোতে।
লালমনিরহাট জোনের (রংপুর বিভাগ) সান্তাহার-মহিমাগঞ্জ হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সুলতানপুর পর্যন্ত বৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে ৪১৭টি। সান্তাহার-আদমদীঘি হয়ে নয়নীবুরুজ পর্যন্ত অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ৯৯টি।
এসব অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে এলজিইডির ১৮৪টি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) পাঁচটি, বাকিগুলো ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের অধীনে। পশ্চিমাঞ্চলে ১ হাজার ৫৬৮টি লেভেলক্রসিং গেটের জন্য গেটম্যান ছিলেন ১৮৯ জন। তাদের মধ্যে এখন ১১৯ জন কর্মরত। বাকি ৭০ জনকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৭০০ গেটকিপার অস্থায়ীভাবে প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছেন। সে হিসাবে ৬৭৯টি লেভেলক্রসিং গেটে কোনো গেটকিপার নেই। এসব অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ের দুই পাশে চারটি পিলার দেয়া আছে। আর দুই পাশে দেয়া আছে দুটি নোটিশ বোর্ড। তাতে লেখা, ‘সাবধান, এ গেইটে কোনো গেটম্যান নেই, পথচারী ও সকল প্রকার যানবাহন চালক নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন এবং কোনোরূপ দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজেই বাধ্য থাকিবেন।’
লালমনিরহাটের নামুড়ী লেভেলক্রসিংয়ের কাছেই মুদি দোকান সেলিম মিয়া বলেন, ‘খুব ঝুঁকি নিয়ে মানুষ পারাপার হয়। কোন দিন করি তো মনে হয়, এই বুঝি ধাক্কা লাগিল। বুকখান সাৎ করি ওঠে। গেট থাকলে এই সমস্যাটা হইল না হয়।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (লালমনিরহাট) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের যেসব গেট আছে, সেগুলোতে লোকবল আছে। রেলপথে অবৈধ গেট যেন বন্ধ করা হয় এবং নতুন করে কোনো গেট তৈরি না করা হয়, সে জন্য এলজিইডি, সওজ, জেলা পরিষদ সহ মেয়রকে চিঠি দেয়া হয়েছে।’
তার দাবি, তারা অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা রোধে নানামুখী উদ্যোগ নিলেও অন্যরা নিষ্ক্রিয় থেকেছে। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা গাইবান্ধা জেলার এলজিইডির বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেছি বিষয়টি নিয়ে। এসব গেট যদি তারা রাখতে চায়, তাহলে তাদের অর্থায়নে লোক নিয়োগ দিতে হবে, সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। তা না হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
এলজিইডি রংপুর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কান্তেশ্বর বর্মন বলেন, গাইবান্ধার প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না জানা নেই। তবে লেভেলক্রসিং নিয়ে চিঠি দেয়া-নেয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে দুই ডিপার্টমেন্ট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
আনন্দবাজার/এম.আর









