- কানের চিকিৎসা সেবা নিতে লাইন বাড়ছে
- গলাবাজি থেকে যন্ত্রবাজি চলছে প্রতিযোগিতা
নেতা, অভিনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এখন গলা বাজিতে পারদর্শি। সব ক্ষেত্রে নিজেকে আলাদা করে জানান দেওয়ার জন্য আমরা উচ্চস্বরে কথা বলি। ফলে ঘরের ঝগড়া শোনা যায় পরের মুখে। সাধারণ কথা-বার্তাতেও একে অপরের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলটা যেন এখন পারদর্শিতায় পরিণত হয়েছে। ভালো কথা বলতে গেলেও আমরা চিৎকার করি। যার চিৎকারের ডেসিবেল যত বেশি, তিনি তত বড় বক্তা। চিৎকার করে কী বলছি, সেটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেন বাঙালি বলতেই আমরা হয়ে গেছি উচ্চস্বরা। আর এ কারণেই হয়তো কবি বলে গেছেন, আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।
বাঙালি জাতি সর্বদায় আত্মচিৎকার করে নিজেকে উপস্থাপন করে নিজের অবস্থান জানান দেয়। সেটা হোক কণ্ঠে কিংবা যন্ত্রে। শুধু যে গলা ব্যবহার করেই আত্মচিৎকার হয়, তা নয়। আত্মচিৎকারের আরও নানাবিধ উপায় আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। বিয়ে বা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানসহ নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইকে গান বাজানো একটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেতার জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী বা বিশেষ দিবসগুলোতে সারাদিন-রাত ধরে উচ্চশব্দে মাইক বাজালেও কেউ তার প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
এ ছাড়াও রাস্তায় গাড়ি হলো বাঙালির আত্মচিৎকারের আরেকটি বড় হাতিয়ার। প্রয়োজন হোক আর না হোক গাড়ি মানেই হর্ন। আর হর্ন হলো বাঙালির মোক্ষম আত্মচিৎকার। হর্নের সঠিক ব্যবহার হয়তো আমরা অনেকে জানিই না। কিন্তু প্রতিনিয়তই আমরা হর্ন বাজিয়ে চলেছি। হর্ন বাজিয়ে যেন আমরা বোঝাতে চাই, দেখো, আমার গাড়ি আছে!
সারাদেশের মতো নওগাঁ শহরেও একই অবস্থা। ছোট্ট এই শহরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ছোট-বড় গাড়ির সংখ্যা। ফলে যানজট এ শহরের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গি। যানজটে পড়ে যে যত পারছে হর্ন বাজিয়েই যাচ্ছে। নিয়ম ও আইনের কোনো বালাই নেই। ‘হর্ন বন্ধের আইন আছে, কিন্তু আমরা কেউ তা মানি না।’ প্রতিটি রাস্তায় হর্নের আইন ভাঙার মহোৎসব চলে যেন।
চালকদের দেখে মনে হয়, আইন ভাঙতেই তারা রাস্তায় নেমেছে। অতিরিক্ত হর্ন আজ পরিণত হয়ছে শব্দত্রাসে। এই শব্দত্রাস আমাদের প্রতিনিয়তই মানসিক ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ করে দিচ্ছে। তার প্রমাণ মেডিকেলের নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারে গেলেই দেখা যায় দীর্ঘ সিরিয়াল। প্রতিনিয়ত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে এই সিরিয়াল।
নওগাঁ শহরের দয়ালের মোড়ে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতালে নাক, কান ও গলা বিভাগে গিয়ে দেখা যায় দীর্ঘ সিরিয়াল। সিরিয়ালের ৩৪ নাম্বার রোগী ৯ বছরের শিশু আরিয়ান। শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৮ বছর বয়স পর্যন্ত আরিয়ান সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবেই শুনতে পেত। কিন্ত বিগত এক বছর থেকে সে আস্তে আস্তে কানে কম শুনতে থাকে। বর্তমানে পিছন থেকে কেউ ডাকলে বা কথা বললে সে কিছুই শুনতে বা সাড়া দিতে পারে না।
নওগাঁ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের ডা. মো. তারেক হোসেন বলেন, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, হৃৎকম্প, শিশুদের লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে যাওয়া, মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত হওয়া, পেটের আলসার, অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বিরক্তি সৃষ্টি হওয়াসহ স্ট্রোকের মতো বড় বিষয় ঘটে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, অসুস্থ রোগী এবং বয়স্করা।
শব্দদূষণ এমনকি মায়ের গর্ভের শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে। যা আগের তুলনাই বর্তমান সময়ে এসব রোগির সংখ্যা আসংখ্যাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেখানে আগে বয়সজনিত কারণে ৬০ বছরের অধিক বয়সের মানুষের শ্রবণশক্তি কিছুটা কমে যেত সেখানে এখন ৪০ এর পরেই সেই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তবে শহরের তুলনাই গ্রামের মানুষ এসব রোগে কম আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নওগাঁ ট্রাফিক পরিদর্শক রেজাউল করিমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমরা প্রতিনিয়তই চালকসহ পথচারিকে দিক নির্দেশনা প্রদান করে যানজট ও শব্দ দূষণ নিরসনে কাজ করছি। এছাড়াও আমরা মাঝে মাঝে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করছি। আগের তুলনাই মানুষ এখন অনেক সচেতন হয়েছে।
ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট এর নেটওয়ার্ক অফিসার আজিম খাঁন জানান, শব্দদূষণ বড় একটি সমস্যা মনে হলেও আমাদের অসচেতনতার কারণে আমরা প্রায়শ বলে থাকি এটার নিরসন সম্ভব নয়। কিন্তু এ সমস্যাগুলো মানুষেরই তৈরি। আমরা একটু সচেতনতা অবলম্বন করলেই এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মানুষের তৈরি এমন একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিবেশগত সমস্যা হলো এই শব্দদূষণ। বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য শব্দের মাত্রার পাঁচটি ভাগ আছে, এলাকা ভিত্তিতে। আর সেই হিসেবে শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা হল ৪০ থেকে ৭০ ডেসিবেল।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যায় না।
আনন্দবাজার/শহক









