🌿 দখলমুক্ত এ বিলে বসেছে প্রাণ-প্রকৃতির মেলা
🌿 ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে অতিথি পাখি
হারিয়ে যাওয়া দুর্লভ প্রজাতির গাছের সমাহার
🌿 তৈরি হয়েছে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের সুযোগ
রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরশহরের পাশে ভাড়ারদহ বিল, অর্ধশতাব্দী আগে যা হারিয়ে গিয়েছিল। দখলমুক্ত করে বিল খননের পর এখানে বসেছে অতিথি পাখির মেলা। হরেক রকমের অতিথি পাখির কিচির-মিচির শব্দে মুখর পুরো বিল এলাকা। শীতপ্রধান দেশ থেকে ছুটে এসেছে নানা জাতের পাখির দল। বিলের পাড়ে নানা প্রজাতির উদ্ভিদের বিপুল সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। স্থানীয়রাসহ আশপাশের অনেকেই বিলের অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য প্রতিদিন ছুটে আসছেন ভাড়ারদহ বিলে।
নদী বা কোনো বড় জলাশয়ের অতলস্পর্শ ও ঘূর্ণিময় অংশকে বলা হয় দহ। দরগঞ্জ উপজেলার জামুবাড়ী মৌজার তেমনি একটি দহ যা ভাড়ারদহ বিল নামে পরিচিত। উপজেলা সদরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত চিকলী ও গডডাংগী নদীর মিলনস্থল বা ঘূর্ণিময় অংশ ছিল এ ভাড়ারদহ বিল। চিকলী নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের ফলে এ অংশটি বিল আকারে তার অস্তিত্ব বজায় রাখে। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে বিলটি ছিল দেশিয় মাছের ভান্ডার। বিলের যৌবনকালে স্থানীয়রা এ বিলে মাছ শিকার করতেন। বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ এখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। দীর্ঘদিনের অবহেলায় পড়ে থাকায় বিলটি একসময় জলাভূমিতে পরিণত হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়রা দখল করে বিলটিকে কৃষিভূমিতে পরিণত করে।
অর্ধশতাব্দী পর এলাকাবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিলটি পুন:খননের উদ্যোগ নেয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। নকশা দেখে বিলের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্পের (ইআইআরপি) আওতায় ১১ দশমিক ৫৯ একরের এ বিলটি গত বছর খনন করা হয়। ভাড়ারদহ বিল ফিরে পায় হারানো প্রাণ।
সরেজমিনে ভাড়ারদহ বিলে গিয়ে দেখা যায়, যেন প্রাণ-প্রকৃতির মেলা বসেছে। বিলের চারপাশ ঘেরা ডাল জাতীয় ফসল অড়হর গাছে। ঝুমঝুম করছে অড়হরের শুটি। ঝোঁপালো অড়হর গাছে বাসা বেঁধে ডিম দিয়েছে ঘুঘু। মাঝেমধ্যে ভেসে আসা ঘুঘুর ডাক বিলের পাড়ে অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি করে। প্রায় ১০০ ফুট চওড়া বিলের পাড়ে লাগানো হয়েছে হারিয়ে যাওয়া দুর্লভ প্রজাতির নানান গাছ। এর মধ্যে রয়েছে সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, নাগেশ্বর, নাগলিঙ্গম, কুরচি, ছাতিম, কদম, চিকরাশি, শ্বেত চন্দন, বকুল, গন্ধরাজ, মহুয়া, শিমুল (বার্মিজ), দেশি শিমুল, পলাশ, কাঞ্চন, হিজল, অশোক, পারুল, তমাল, চাঁপা, করম, বাজনা, গৌরিচৌরি, রাধাচূড়া, কাঠমল্লিকা, মাধবীলতা, টগর, হৈমন্তী, ডুমুর, ঢেউয়া, খড়কি জাম, কোরিয়ান জাম, কতবেল, আঞ্জির, জাফরান, হরীতকী, আমলকী, পানিয়াল, গাব, ননিফল, বুদ্ধ নারিকেল, বিলম্বি, গামারি, কাইজেলিয়া, ইপিল, বাবলা, বওলা, জিগনিসহ শতাধিক প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের গাছ। সেই সাথে বিলে তৈরি হয়েছে মাছ চাষের বড় সুযোগ।
বিলে মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করেছে অতিথি পাখির ঝাঁক। পাতি সরালি, জলময়ূর, চাপাখি, লরীয়তিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর পুরো বিল এলাকা। একটু প্রশান্তির খোঁজে বিলের পাড়ে ছুটে আসছেন এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন এলাকার প্রকৃতিপ্রেমীরা। দুর্লভ গাছে ভরা সবুজ প্রকৃতি, পাখ-পাখালির অবাধ বিচরণ মন কাড়ছে তাদের।
স্থানীয় শিক্ষক হেলাল হোসেন শাহ বলেন, বদরগঞ্জে এখন দৃষ্টিনন্দন এলাকা হয়ে উঠেছে ভাড়ারদহ বিলটি। যা অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার ও খনন ছিল এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি। স্থানীয় কৃষক মজনু মিয়া বলেন, ভাড়ারদহ বিলের পাড়ে যে গাছগুলো লাগানো হয়েছে এর বেশিরভাগের নামই আমরা জানি না। এখানে অনেক দুর্লভ প্রজাতির গাছ রয়েছে। যা দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ছুটে আসছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বদরগঞ্জের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক বলেন, ভাড়ারদহ বিল সরকারি নথিতে বিল উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এটি জলাভূমি ও কৃষি ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। কাজের শুরুতে অবৈধ দখলদারদের নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। স্থানীয়দের সহযোগিতায় গত বছরই খনন কাজ শেষ করা হয়। দৃষ্টিনন্দন এ বিলের পাড়ে হারিয়ে যাওয়া দুর্লভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। যারা গাছ নিয়ে গবেষণা করেন কিংবা শিক্ষার্থীদের গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এ বিলের গাছগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইআইআরপি প্রকল্পের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান আনন্দবাজারকে বলেন, ‘ভাড়ারদহ বিল উদ্ধার ও পুন:খননের মাধ্যমে তার পুরোনো অস্তিত্ব ফিরে পেয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে বিলের দু’ধাওে লাগানো গাছ এলাকার প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র ও পরিবেশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এলাকার বিনোদনের জায়গা হিসেবে বিলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি জানান, এলাকাবাসী তাদের দৈনন্দিন কাজে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের সুযোগসহ বিলে হাঁস ও মাছ চাষের পাশাপাশি সঞ্চিত পানি সেচ কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে আসবে।
আনন্দবাজার/শহক









