করোনাকালে সীমিত আকারে হলেও নিম্নবিত্তের জন্য রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা, ত্রাণ ও ব্যক্তি উদ্যোগের সহায়তা রয়েছে৷ উচ্চবিত্তের জন্য রয়েছে প্রণোদনা, এই দুই শ্রেণির মানুষ বিপদে-আপদে ব্যক্তি অথবা রাষ্ট্রের সহায়তা প্রার্থনা করতে পারে৷ কিন্তু বিত্ত যাদের বেশি বা কম নয়, তারাই মধ্যবিত্ত৷ তারা যখন বিপদে পরে নিরবেই নিজেকে গুছিয়ে নেয়। তারা চাইতে পারেনা ব্যক্তি উদ্যোগের সহায়তা। এমনকি সরকারি প্রণোদনার তালিকায় থাকেনা তাদের নাম।
করোনা মহামারীতে রাজধানী ছাড়ছেন মধ্যবিত্তরাই বেশি। অথচ ২০-৩০ বছর বসবাস করেও উঠতি মধ্যবিত্ত ঢাকাবাসীকে এক করোনার রাতে ছোট্ট পিকআপে সওয়ার হয়ে গ্রামে চলে যেতে হয়৷ বাড়ি ভাড়া তাকে দিতে হবে না, পকেটের বাকি টাকাগুলো ফুরোলে আত্মীয়স্বজন হয়ত দিনকতক তার ডাল-ভাতের জোগান দেবে৷ কিন্তু করোনাকাল আরো দীর্ঘায়িত হলে কী হবে তা কি আপাত গ্রামে ফিরে যাওয়া উঠতি মধ্যবিত্ত জানে? গ্রামে তো সুযোগ কম৷ সে কি আবার ফিরতে পারবে ফেলে যাওয়া ঢাকায়, নতুন করে পাততে পারবে সংসার?
লকডাউনের ফলে কাজ বন্ধ বা কমে গেলে নিম্নবিত্তরা ঢাকা শহরে একমাসও টেকেনি৷ পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা বেতনের আশায়, কিংবা চাকরিতে যোগ দিতে মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে কোনোটাই না পেয়ে একবার ফিরে গেছে গ্রামে, আবার পরে এসেছে৷ উঠতি মধ্যবিত্ত এপ্রিল মাসটা কায়ক্লেশে কাটিয়ে দিতে পারলেও মে-জুন মাসে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে৷ কেন এই উঠতি মধ্যবিত্ত তিনমাস ঢাকা শহরে টিকে থাকতে পারে না? কারণ, প্রত্যেককে তার আয়ের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ খরচ করতে হয় বাড়িভাড়া মেটাতে৷ পরিসংখ্যান মতে, গত ২০ বছরে অনেকগুণ বাড়িভাড়া বেড়েছে৷ ন্যূনতম খাবার খরচ, শিক্ষা, যাতায়াত, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ বিল, গ্রামে থাকা মা-বাবার দেখভাল করে আর মোবাইল বিল খরচ করে আর কীই বা থাকে তাদের পকেটে? প্রতিমাসের শেষ ক'টা দিন ধারদেনা করে চলে, কোনো সঞ্চয় নেই, জমানো টাকা থাকে না৷ রাষ্ট্র বাড়িভাড়ার লাগামে হাত দিলে এদেরও সঞ্চয় থাকতো, নিদেনপক্ষে কয়েকমাস টিকে থাকার৷ এক হিসেব বলছে, এরই মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি লোক ফিরে গেছে গ্রামে৷ উঠতি মধ্যবিত্তের একটা অংশ কম ভাড়ার বাসায় চলে যাচ্ছেন৷ কেউ কেউ পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে কম ভাড়ার মেসে গিয়ে উঠেছেন৷ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাড়িগুলোর ফটকে ঝুলছে অজস্র টু-লেট৷
মধ্যবিত্তের বড় ভয় অনিশ্চয়তা৷ যেখানে আছে সেখান থেকে নেমে যাওয়ার ভয়৷ করোনাকালে সেই অনিশ্চয়তা প্রকট আকারে হাজির হয়েছে মধ্যবিত্তের সামনে, তাকে সাথে করেই পাড়ি দিতে হবে অন্তহীন ভবিষ্যৎ৷ হয়ত ক্ষয়ে যাবে সংখ্যায়৷ নেমে যাবে নিঃশব্দে দারিদ্রসীমার একটু নীচে৷ সংসার চালানোর জন্য পোড় খাওয়া স্ত্রী গভীর রাতে স্বামীর হাতে তুলে দেবেন বিয়ের গয়না কিংবা ঘুরতে যাওয়ার জমানো টাকা৷ সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার জন্য হয়ত বাবা ভিটেটা বন্ধক রাখবেন৷ আরো এক প্রজন্ম পরে হয়ত আবার তারা মধ্যবিত্তে উন্নীত হবেন, অথবা হবেন না৷ খাবারের তালিকায় আমিষ কমতে থাকবে, তার জায়গা নেবে কমদামী সবজি কিংবা শর্করা৷ সামনের বেশকিছু ঈদে হয়ত আর নতুন জামা-কাপড় কেনা হবে না৷ নীরবে চোখের পানি ফেলবেন কেউ কেউ৷ তবুও কেউ যেন টের না পায়৷ মধ্যবিত্ত তো এমনই৷ উঠতি মধ্যবিত্তের আর্থ-সামাজিক আর মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা মাত্র শুরু হয়েছে৷ করোনাকালে সামাজিক স্তরবিন্যাসের উলম্ব সরলরেখা ধরে নামতে নামতে কোথায় সে আটকে যেতে পারবে-তার উত্তর সম্ভবত উঠতি মধ্যবিত্তের জানা নেই৷
আনন্দবাজার/এফআইবি








