মুনির আহমদ
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দুই বছর অতিবাহিত হলো। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সেনা ছাউনি ও পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে আক্রমনের জের ধরে মায়ানমার সেনাবাহিনী সে দেশের রাখাইনে ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ নামে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরু করে। অভিযানে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের অনুসৃত কুখ্যাত যুদ্ধ কৌশল Three All নীতি অনুসরণ করে। যার মূলে ছিল- সবাইকে হত্যা কর, সব কিছু পুড়িয়ে দাও, সব কিছু লুট কর।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই পোড়ামাটি নীতি রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ভিটেমাটি আঁকড়ে টিকে থাকতে দেয়নি। জীবন বাঁচাতে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে গন্তব্যহীন পথে পা বাড়ায়। অবশেষে বন, জঙ্গল, দূর্গম পাহাড়ী পথ এবং সাগর নদী ও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সে সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি। কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে তারা গাদাগাদি করে বাস করছে। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে শিবিরে জন্ম নেয়া আরো এক লাখ নতুন রোহিঙ্গা শিশু। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গার বর্তমান সংখ্যা প্রায় ১২ লাখেরও বেশি।
মানবতার খাতিরে বাংলাদেশ সেই সময় সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়ে এসব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। মানবতার এই দৃষ্টান্ত আন্তজার্তিকভাবেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্ত ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক ২ বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদে কথা থাকলেও গত দুই বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মায়ানমার ফেরত নেয়নি। বরং গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম চলতি বছরের ২২ আগষ্ট দ্বিতীয় দফায় স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গার স্বদেশে প্রত্যাবাসনের দিনক্ষন ঠিক হলেও কেউ ফেরত যায়নি।
এক্ষেত্রে ৩টি কারণ দায়ী। প্রথমত- চুক্তি বাস্তবায়নে মায়ানমার সরকারের সময় ক্ষেপন কৌশল। দ্বিতীয়ত- সম্প্রতি করা রোহিঙ্গাদের কিছু দাবী। রোহিঙ্গারা বলছে, নাগরিকত্ব, সম-অধিকারসহ রাখাইনে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা এবং বসতভিটার মালিকানা ও নির্যাতনের বিচার না পাওয়া পর্যন্ত মায়ানমারে ফিরে যাবে না। ২৫ আগষ্ট উখিয়ার কুতুপালং এর সম্প্রসারিত ক্যাম্পে এক বিশাল সমাবেশ করে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তারা উক্ত শর্তগুলো জুড়ে দেয়।
তৃতীয়ত- আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিশেষ করে জাতিসংঘসহ আন্তজার্তিক বিভিন্ন সংস্থাগুলো বলছে, রোহিঙ্গারা শিগগিরই মিয়ানমারে ফিরতে পারে বা সেখানে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে- এমন কোন প্রমাণ তারা এখনও খুঁজে পায়নি। জাতিসংঘের তদন্ত দল এর মতে, বরং রাখাইন অঞ্চলে মায়ানমার সরকার পুলিশের ব্যারাক, সরকারী বিভিন্ন স্থাপনা এবং শরনার্থী শিবির প্রতিষ্ঠা করছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের আশু সমাধান সুদুর পরাহতই বলে মনে হচ্ছে।
বিপুল সংখ্যার এই জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশের জন্য বিষফোঁড়া। তাদের উপস্থিতি মরার ওপর খাড়ার ঘা এর মত। বিশেষ করে তাদের উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান এই জনশক্তি টেনে ধরবে আমাদের উদীয়মান অর্থনীতির চাকা। কেননা এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বহন করার মত আর্থিক সংগতি বাংলাদেশের নাই।
এমনিতেই বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। সেই সাথে যুক্ত হওয়া ১২ লাখের অধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার আর্থিক চাপ বাংলাদেশের পক্ষে নেয়া অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তারই ইংগিত দিয়ে চলতি সংসদে বলেছেন, মিয়ানমারের ১১ লাখের বেশি নাগরিকের জন্য খাদ্য, পোষাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা আমাদের জন্য খুব কঠিন ব্যাপার।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ও ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধিও বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে। বিগত অর্থমন্ত্রীও সেই কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ছে।
রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি আমাদের পর্যটন শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এক হিসেবে দেখা যায়, ২০১৭ সালে পর্যটন মৌসুমে বাংলাদেশ প্রায় ১০ লাখ পর্যটকের বাজার হারায়। সেই সময় রোহিঙ্গা সংকটের কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে দীর্ঘদিন জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ঐ অঞ্চলে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল শূন্যের কোটায়। তখন পর্যটকবাহী জাহাজ ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকা। সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে।
রোহিঙ্গাদের কারণে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান কক্সবাজারও প্রায় ধ্বংসের প্রান্তে। আগত রোহিঙ্গারা টেকনাফ ও উখিয়ার ৬,১৬৩ একর বনভূমিতে নিজেদের বসতি গড়েছে। জ্বালানী সংকট মেটাতে প্রতিদিন পুড়িয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার টন গাছ। এতে যেমন বনজ সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে তেমনি যেখানে সেখানে ঝুঁপড়ি তৈরির কারনে নষ্ট হচ্ছে কক্সবাজার অঞ্চলের সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম।
পাহাড় ধ্বংস ও বন উজাড়ে বেড়েছে পরিবেশগত ভারসাম্য ও বিপর্যয়ের ঝুঁকি। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল (ইউএনডিপি) রোহিঙ্গা শিবির স্থাপন নিয়ে তাদের ‘দ্রুত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে’ বলেছে, রোহিঙ্গাদের শিবিরগুলো পরিবেশগত সংকটাপন্ন তিনটি এলাকার প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছে। এগুলো হলো- টেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল এলাকা, সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপ। এছাড়াও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শিবিরগুলোর কাছাকাছি সংরক্ষিত এলাকা টেকনাফের অভয়ারণ্য, হিমছড়ি ন্যাশনাল পার্ক এবং প্রস্তাবিত ইনানী ন্যাশনাল পার্ক।
বর্তমানে টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে রোহিঙ্গারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই সেখানে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, স্থানীয় বাসিন্দারা উদবাস্তু অবস্থায় আছে। পাহাড়-পর্বতসহ স্থানীয়দের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিও রোহিঙ্গারা গ্রাস করতে চলেছে। সেখানে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। আশ্রয় শিবিরগুলিতে নিজেরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, ত্রাণ বিতরণ কর্মী এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করার দু:সাহস দেখিয়েছে।
গত ২২ আগষ্ট রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক যিনি ২ বছর আগে এই রোহিঙ্গাদের শত শত পরিবারকে আশ্রয় ও তাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের অনেকেই সক্রিয় রয়েছে ডাকাতি, ইয়াবা, মাদক ও মানব পাচারের মত জঘন্য অপরাধী চক্রের সাথে। এসব কাজে তাদের সম্পৃক্ততা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ৭৬টি মামলায় ১৫৯ জন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০১৮ সালে ২০৮টি মামলায় ৪১৪ জন এবং চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে ১৮৭টি মামলায় ৫১৫ জন রোহিঙ্গাকে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। রোহিঙ্গা উপস্থিতি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। কেননা রোহিঙ্গাদের অনেকেই মরণব্যাধি এইডস রোগে আক্রান্ত। এর বিস্তার হলে বাংলাদেশের মানুষ সেই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার Lowy Institute এর গবেষক খালিদ কোসার ও লাইলা সুমিডি লোসান রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে ‘টাইম বোম্ব’ এর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ায় উগ্রবাদ বিস্তার করতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশংকাও তাই। তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের উপর উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরী হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর অব. এমদাদুল ইসলাম বলেন, পারষ্পারিক ভূকৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করার জন্য অনেকে উঠে পড়ে লাগবে। সেখানে রোহিঙ্গারা যুক্ত হয়ে পড়বে। এতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি হুমকিতে পড়বে। কারো কারো মতে, ক্ষুধা, দারিদ্র, হতাশা এবং দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা, অবজ্ঞা, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বর্বর নির্যাতন ও নিপীড়নে থাকায় এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতার হার বেশি।
দেশি বিদেশি বিভিন্ন কুচক্রী মহল আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েও রোহিঙ্গাদের আইন-শৃঙ্খলা বিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ডসহ জঙ্গীবাদ বা ধর্মীয় উগ্রবাদী কাজে ব্যবহার করতে পারে। এটা হলে কক্সবাজারসহ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটার এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভবনা তৈরী হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ২৬ জুন সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন করা না গেলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) বাংলাদেশে অবস্থাজনিত সমস্যা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে প্রকাশিত তাদের এক সমীক্ষায় বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটটি পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। এই সংকটের সুযোগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগসাজশ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি রয়েছে।
রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের নয়। এই সমস্যার পিছনে বাংলাদেশের কোন ভূমিকাও নেই। সমস্যার সৃষ্টি ও কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে, সমাধানও তাই সেখানে। মিয়ানমারকে এই সমস্যা সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে। বাংলাদেশের উচিৎ সেই লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইউডা।







