কমিউনিটি ক্লিনিকের বেহাল অবস্থা
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব ক্লিনিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরামর্শসহ বিভিন্নসেবা প্রদান করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ জেলার বেশির ভাগ উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্বরত কর্মীদের অবহলোর কারণে সরকারের এ মহতী উদ্যোগ বাঁধার মুখে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে সবকিছু দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ইচ্ছেমত চলতে থাকায় এখন বেশিরভাগ ক্লিনিকের অনিয়মগুলোকে বেশ নিয়মে পরিনত করছেন তারা। এতে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে। গত কয়েকদিন বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে অনিয়মের নানা চিত্র পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলায় মোট ২৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকে একজন সিএইচসিপি ছুটির দিন ছাড়া সপ্তাহে ৬ দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে। এছাড়া সপ্তাহে দুইদিন একজন স্বাস্থ্য সহকারি ও একজন পরিবার কল্যাণ সহকারি সেবা ও পরামর্শ দেয়া এবং অবশিষ্ট দিনে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার নিদের্শনা রয়েছে। তবে ২৫টির মধ্যে ৮টিতে এইচএ ও ৬টিতে এফডব্লিউএ নেই। কাগজপত্রে এসব তথ্য থাকলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন দেখা গেছে। সরেজমিনে ১৩টি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্লিনিকের সিএইচসিপি ঠিক সময়ে ক্লিনিকে আসেন না। ক্লিনিকগুলোর কোনো কোনোটি সপ্তাহে ৩-৪দিন খোলা থাকে। ঠিক সময়ে খোলা না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্লিনিক খোলার সঠিক সময় নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টায় সৈয়দ নগর ক্লিনিকে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়।
রাজনগরের স্থানীয় বাসিন্ধা কামাল মিয়া বলেন, ক্লিনিক সপ্তাহে ২-৩দিন খোলা হয় বড়জোর। কখনো রোগী এসে ফিরে যান। সকাল ৯টা ৪০ ঘটিকায় সালন সিসি বন্ধ পাওয়া যায়। একই দিন সকাল ১০টা ২০ ঘটিকায় দাশপাড়া সিসি বন্ধ পাওয়া যায়। পাঁচ মিনিট পরে সিএইচসিপি স্বপন কুমার পাল কিøনিক খোলেন। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, বাড়ি দূরে থাকায় আসতে দেরি হয়ে যায়। শনিবার সকাল ৯টা ২৬ মি. গেলে আবারও এ সিসি বন্ধ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ২৮ মি. নন্দীউড়া সিসিতে গিয়ে দেখা যায় এমএইচভি বর্ষা অর্জুন বসে আছেন। সিএইচসিপি কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই এসে যাবেন। এর ঠিক ৫ মিনিট পর সিএইচসিপি মিতালী পাল ক্লিনিকে আসেন। তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলে তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারবেন না। যদিও কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে ক্লিনিকের বাইরে থাকলে আগে থেকে কর্তৃপক্ষকে জানানোর নিয়ম রয়েছে কিন্ত তিনি সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তাৎক্ষনিক দেরিতে আসার বিষয়টি সিসি ইনচার্জকে মোবাইল ফোনে অবগত করেন। শনিবার আবারো ওই সিসিতে গেলে দেখা যায় জ্বর-সর্দির সমস্যা নিয়ে নন্দীউড়া গ্রামের লায়েক আলী সেবা নিতে এসেছেন। এ সময় তাকে চিকিৎসা ও ঔষধ দেন এমএইচভি বর্ষা অর্জুন। বর্ষা অর্জুন জানান সিএইচসিপি ছুটিতে আছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী সিএইচসিপি ছুটিতে গেলে স্বাস্থ্য সহকারি বা পরিবার কল্যাণ সহকারি সিসিতে রিলিভার হিসেবে থাকার কথা। পরে মুশুরিয়া সিসিতে গিয়ে সিএইচসিপি রুমেনা আক্তার ও এইচএ সৌমিত্র দেবকে পাওয়া যায়। এফডব্লিউএ বদলি হয়ে যাওয়ায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে একজন এফডব্লিউএ ভ্যাকসিন দিতে আসেন বলে জানান। বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টা ২৫ ঘটিকায় বড়দল সিসিতে গিয়ে খোলা দেখা গেলেও শনিবার সকাল ১০ টা ২২ ঘটিকায় বন্ধ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টা ৪০ ঘটিকায় বালিগাঁও সিসিতে গেলে বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন মিয়া জানান, ক্লিনিক সপ্তাহে ২-৩ দিন বন্ধ থাকে। খোলা হলেও সকাল ১০-১১টায় খোলা হয়। মাঝে মাঝে রোগী এসে অপেক্ষা করে ফিরে যায়। চকিরা ওই সিসি খোলা থাকলেও এ সিসিতে কোনো এফডব্লিউএ ও এইচএ দীর্ঘদিন ধরে নেই বলে জানান সিএইচসিপি অর্ধেন্দু দাস। শুধু ভ্যাকসিন দিতে অন্য সিসি থেকে দুইজন আসেন। ওইদিন দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে পর চক্র সিসিতে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়।
শনিবার কামালপুর সিসিতে সকাল ১০ টা ৪০ ঘটিকায় গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। এর ৭ মিনিট পর ভারপ্রাপ্ত সিএইচসিপিকে দরজা খুলতে দেখা যায়। তবে সোনাটিকি, কান্দিগাঁও, করিমপুর সিসিতে নির্ধারিত সময়ে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা নিতে দেখা গেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আফজালুর রহমান জানান, আমি এখানে নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। ইতিমধ্যে সিএইচসিপিদের সময়ানুবর্তী ও দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিকে আমরা এখন থেকে নিয়মিত পরিদর্শনে যাব। শিগগিরই এ অবস্থার পরিবর্তন দেখতে পাবেন বলেও উল্লেখ্য করেন এই কর্মকর্তা।









