হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা সিএস ও টিএইচও গ্রুপে বিভক্ত হওয়ায় রোগিরা হয়রানির শিকার হচ্ছে
আমার ভুল চিকিৎসায় কখনও কোনো রোগি মারা যায়নি। এমনকি আমি রোগিদের থেকে কোনো টাকাও নেই না। জনগণের সেবার স্বার্থে ছুটির দিনে চিকিৎসা দিতে স্থানীয় এমপির অনুরোধে ওখানে অপারেশন করি : ডা. সুজাত আহমেদ, সিভিল সার্জন
সরকারি হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে অপারেশন করা যাবে না। যদি কেউ করে থাকে তাহলে উপযুক্ত প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে : ডা. মো. মনজুরুল মুরশিদ
কয়রার জনগণের স্বার্থে ইউএইচএন্ডএফপিও এর সঙ্গে সমন্বয় করে অপারেশন করার জন্য বলেছি। তবে অর্থ নেওয়ার কোন কথা ছিল না। উনি এখন সিভিল সার্জন, একটা বড় জায়গায় আছেন, টাকা নেবে এটা আমি চিন্তাও করতে পারিনা : আক্তারুজ্জামান বাবু, সংসদ সদস্য
উপকূলীয় খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজস্ব ক্লিনিকে পরিণত হয়েছে। খুলনা জেলা সিভিল সার্জন নিজেই অর্থের বিনিময়ে কয়েক বছর প্রাইভেট প্রাকটিস করছেন সেখানে। আর সেখানে সিভিল সার্জনের অপারেশনের অনুমতির ব্যবস্থা করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা ওপেন সিক্রেট দু’গ্রুপে (সিএস ও টিএইচও) বিভাজন হওয়ায় টানাপোড়নে রোগিরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত সেখানে সিভিল সার্জন অবস্থান করায় হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় চরম জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, দু’গ্রুপের টানাপোড়নে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি ৩০ দিনের ব্যবধানে চারজনসহ বেশ কয়েকজন প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আর সিভিল সার্জনের ভুল চিকিৎসায় রোগি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তবে কোনো ঘটনা কখনও মামলা পর্যন্ত গড়ায়নি। অভিযোগ রয়েছে, তার নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের গ্রুপটি খুবই প্রভাব দেখায় এবং মানুষকে কনভেন্স করার ক্ষমতা অনেক বেশি। ম্যানেজ করে যে কোন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া তাদের কাছে মামুলি ব্যাপার।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৩, ১৪ ও ১৫ অক্টোবর সিভিল সার্জন ১৪টি এপেন্ডিসসাইটিক্স, ৪টি সিজারসহ মোট ১৯টি অপারেশন করেছেন।
মঙ্গলবার সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে অন্তত ১০ জন রোগির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে ডা. সুজাত আহমেদ অস্ত্রোপচার করেছেন। হাসপাতাল থেকে ফ্রি ওষুধ দেয়া হচ্ছে। তবে কিছু ওষুধ নিজেদেরকে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। জানা যায়, এপেন্ডিসসাইটিসের অপারেশনে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ও সিজারে (সি সেকশন) ৬/৭ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে।
তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদিপ বালার কাছে অস্ত্রোপচার করা এক প্রসূতিকে পাওয়া যায়। তিনি জানান, তার সকল ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেয়া হচ্ছে এবং সিজারের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
বাগালী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এপেন্ডিসসাইটিসের এক রোগীর অভিভাবক জানান, সাড়ে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ডা. সুজাত আহমেদ অপারেশন করেছেন। কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে দিচ্ছে আর কিছু বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
কথা হয় ফাতেমা নামক এক প্রসূতির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার কপালের দোষ। ১০ মাস পেটে ধারণ করেছি, আধা ঘন্টার মধ্যে বাচ্চা মরা পাই। অপারেশনের আগে বাচ্চা পেতে নড়াচড়া করছে। আমার মনে হয় বাচ্চা জীবিত ছিল। ওরা আমার জন্য খুব কষ্ট করেছে। প্রচুর ব্লিডিং হয়েছিল। আমি এখন অনেকটা সুস্থ আছি।’
তার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬ হাজার টাকা চুক্তিতে পূর্ব পরিচিত সিভিল সার্জন তাকে অপারেশন করেছিল। তবে ১২ হাজারের ওপরে খরচ হয়ে গেছে। অপারেশনের জন্য হাসপাতালে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ওটিতে নেয়া হয়। কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়নি। কোনো ব্যথাও ওঠেনি। অপারেশন করার পরে তার পরিবারের কাছে মৃত বাচ্চা দেয়া হয়। এদিকে প্রসূতির প্রচুর ব্লিডিং হতে থাকে। একপর্যায়ে হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসক থাকতেও পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. সুজন কুমার সরকারকে আনা হয়। তিনি এসে রক্ত বন্ধ করতে সক্ষম হন। একটু হৈচৈ হতেই সিভিল সার্জনের পূর্ব অভিজ্ঞ ম্যানেজিং টিম নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।
আরও জানা যায়, এ ধরণের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর মাস খানেক পূর্বে এক রোগির সমস্যা হওয়ায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যস্থতায় ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। তারপূর্বে ২০২০ সালে মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে ওই হাসপাতালে চার জন প্রসূতি মারা যায়। তখন এলাকায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। বেশ কিছুদিন সিভিল সার্জন হাসপাতালে অপারেশন করা বন্ধ রাখেন। পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ফের সরকারি সুবিধা নিয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস শুরু করেন। তবে আগের তুলনায় পরিচিত মহলে খরচ কিছুটা কম নেয়া হলেও অপরিচিতদের থেকে পুষিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রোগি ও রোগির স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, তিনি অস্ত্রোপচারের সময় কোনো অচেতনবিদ রাখেন না। অচেতন করার ওষুধ নিজেই প্রয়োগ করেন। এছাড়া যথাযথ অচেতন হওয়ার পূর্বেই অস্ত্রোপচার শুরু করেন এমন অভিযোগও কম নয়। রোগি চিৎকার করলেও কর্ণপাত করেন না।
জানা গেছে, খুলনা সিভিল সার্জনের গ্রামের বাড়ি কয়রা উপজেলায়। সিভিল সার্জন হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার আগে তিনি ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ছিলেন এবং তখনও অর্থের বিনিময়ে অস্ত্রোপচার করতেন।
হাসপাতালের অচেতনবিদ ডা. পলাশ টিকাদার বলেন, সিভিল সার্জনের কোন অপারেশনে আমি থাকিনা। উনি নিজেই সব করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদিপ বালা বলেন, স্যারের অপারেশন সবগুলো কাগজ কলমে দেখানো হয়না। আর এমপি স্যারের অনুমতিতে তিনি এখানে ওটি করেন এবং আমাদের বিভাগীয় অফিস এটা অবগত।
সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, আমার ভুল চিকিৎসায় কখনও কোন রোগি মারা যায়নি। আর ফাতেমার পেটে বাচ্চা মৃত ছিল, মা ভালো আছে। রোগির অবস্থা খুব খারাপ থাকায় খুলনায় না পাঠিয়ে দ্রুত ওখানে অপারেশন করা হয়। তিনি আরও বলেন, রোগিদের থেকে কোন টাকা নেয়া হয়না। জনগণের সেবার স্বার্থে ছুটির দিনে চিকিৎসা দিতে স্থানীয় এমপির অনুরোধে ওখানে যেয়ে অপারেশন করি।
ডা. মো. মনজুরুল মুরশিদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে কোন অপারেশন করা যাবে না। যদি কেউ করে থাকে তাহলে উপযুক্ত প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, উনি কয়রার মানুষ। এলাকার অনেকেই উনাকে চায়। এজন্য জনগণের স্বার্থে ওখানকার ইউএইচএন্ডএফপিও এর সঙ্গে সমন্বয় করে অপারেশন করার জন্য বলেছিলাম। তবে অর্থ নেওয়ার কোন কথা ছিল না। উনি এখন সিভিল সার্জন, একটা বড় জায়গায় আছেন, টাকা নেবে এটা আমি চিন্তাও করতে পারিনা। পরবর্তী মাসিক মিটিংয়ে এ বিষয়গুলো নিরসন করার আশ্বাস দেন তিনি।









