জাতীয় সংসদে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটে ‘ধর্মীয় বৈষম্য’-এর কোনও পরিবর্তন না আসায় ‘তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ’ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সংগঠনের নেতারা বলছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি বাজেট বরাদ্দ সীমাহীন অবজ্ঞা, অবহেলা ও বৈষম্যের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ।
মঙ্গলবার (২০ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেট বৈষম্য শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাণা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ এবং উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্যে বরাদ্দ মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের সঙ্গে যা একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, এদেশের ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও কল্যাণে গঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন চলে প্রতি বছরের বাজেট বরাদ্দ থেকে। আর হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টগুলো চলে আমানতের সুদের টাকায়। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের উদাহরণ টেনে বলা হয়, এ প্রতিষ্ঠানের জন্যে মোট স্থায়ী আমানতের ১০০ কোটি টাকা থেকে প্রতি বছরে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ থেকে ৫ কোটি থেকে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা সুদ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি পেয়ে থাকে। উক্ত টাকা থেকে বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা অফিস খরচ ও বাদবাকি ৪ কোটি টাকা দুঃস্থদের, মন্দিরে অনুদান ও ক্ষুদ্র পরিসরে বিভিন্ন তীর্থ স্থানে তীর্থ পরিক্রমার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করে থাকে।
হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টে বর্তমানে জনবল রয়েছে ৯ জন, তার মধ্যে ২ জন মুসলিম সম্প্রদায়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে জেলাসমূহে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রায় ৪০ শতাংশ ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের। ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরোহিত ও সেবায়েত দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পটি হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। এই প্রকল্পের জনবলের মধ্যেও ১০ শতাংশের বেশি ইসলাম ধর্মাবলম্বী।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র সরকার কর্তৃক স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যার ফলশ্রুতিতে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। এদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী হিন্দু সম্প্রদায় প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় চেতনাহীন ও নৈতিক শিক্ষাহীন হয়ে গড়ে উঠছে।’
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তাদের ছয়টি দাবি তুলে ধরে। তাদের দাবিগুলো হলো— ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও কল্যাণে জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে বার্ষিক বরাদ্দ প্রদান করে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টগুলোকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তরকরণ; ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন; ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঠিক শুমারির উদ্যোগ গ্রহণ; প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মডেল মন্দির, প্যাগোডা বা গীর্জা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন; বিগত পাঁচ দশক ধরে বাজেটে ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে ৫ হাজার কোটি টাকা সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন ও কল্যাণে থোক বরাদ্দ প্রদান; বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জাতীয় পে-স্কেলভুক্তকরণ।
বাংলাদেশ হিন্দু বিদ্যুৎ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ড. নিমচন্দ্র ভৌমিকের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথের সঞ্চালনায় এসময় আর উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় প্রমুখ।
আনন্দবাজার/শহক









