চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার ৯নং পরৈকোড়া ইউনিয়নটি ছিল একসময় উপজেলার সবদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এ ইউনিয়নে এককালে ছিলেন ৯ জন বড় বড় জমিদার। তাদের মধ্যে যোগেস চন্দ্র রায় বাহাদুর ও প্রসন্ন কুমার ছিলেন অন্যতম। পুরো চট্টগ্রামে ছিল তাদের জমিদারির বিস্ততি। একসময় যখন দেশের কোথাও বিদ্যুৎ ছিলনা তখন এই পরৈকোড়াতেই জমিদার প্রসন্ন কুমারের বাড়িতে জেনারেটরের সাহায্যে জ্বলত বৈদ্যুতিক বাতি। প্রজাবৎসল হিসেবে এসব জমিদারের ছিল সুখ্যাতি। প্রজাদের সুবিধার্তে এ ইউনিয়নে খনন করেছিলেন তারা অসংখ্য দিঘী, নির্মাণ করেছিলেন হাট-বাজার, ব্রিজ- কালভার্ট, রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয়সহ অনেক কিছু। আজ সেইসব স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে চারশ’ বছরের প্রাচীনতম পরৈকোড়া যোগেশ চন্দ্র সেনের জমিদার বাড়ি। এটি এখন পরিত্যক্ত ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। অথচ এই বাড়িটিকে ঘিরে রয়েছে প্রায় তিনশ’ বছরের পুরনো ইতিহাস।
কালের বিবর্তনে প্রায় ধ্বংসের পথে এই বাড়ির অধিকাংশ ভবন। জঙ্গলে ঢেকে গেছে বেশিরভাগ অংশ। খসে পড়ছে ভবনের পলেস্তারা। অবহেলায় প্রাচীন পূরার্কীতির এই ঐতিহাসিক বাড়ি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ জমিদার বাড়িটি ভ্রমণ পিপাসুদের মনে আনন্দের খোরাক যুগিয়ে আসছে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে বাড়িটি তার জৌলুস হারাতে বসেছে।
ইতিহাস থেকে জানা গেছে, জমিদার শান্তিরাম কানুনগো ১৬০০ সালের দিকে এই জমিদার বংশের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে তার পুত্র দেওয়ান বৈদ্যনাথ এই জমিদারী পরিচালনা করেন। দেওয়ান বৈদ্যনাথের পরে জমিদারী পরিচালনা করেন তার পুত্র হরচন্দ্র রায়। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তাই তিনি দত্তক নেন গিরিশ চন্দ্রকে। এরপর তিনিই এই জমিদারী পরিচালনা করতে থাকেন। কিন্তু গিরিশ চন্দ্র রায় মাত্র ২৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করলে তার স্ত্রী নয়নতারা যোগেশ চন্দ্রকে দত্তক নেন। এরপর তার মৃত্যু হলে এই পুরো জমিদারীর হাল ধরেন যোগেশ চন্দ্র রায়। তিনি পরৈকোড়া এলাকার একটা মধ্য ইংরেজী স্কুলকে তার পালক মায়ের নামে ‘নয়নতারা উচ্চবিদ্যালয়’ নামকরণ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। তারপরে তাঁর তিন ছেলে পূর্ণেন্দু বিকাশ রায়, সুখেন্দু বিকাশ রায় ও অমলেন্দু বিকাশ রায় জমিদারির হাল ধরলেও ধীরে ধীরে জমিদারি জৌলুশ হারাতে থাকে। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় শত বছরের জমিদারি ইতিহাস।
জমিদার বাড়িতে বসবাসকারী নিবারন দাশের ছেলে দুলাল দাশের সাথে সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ইট-সুঁড়কি দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে জমিদার বাড়ির ভবন ও মঠগুলো। এই বাড়িতে পাঁচটি দালান রয়েছে। এরমধ্যে তিনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়ির ভিতরে রয়েছে বিশাল দীঘি। আরও রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটি পুকুর। বাড়ির পশ্চিম পাশে রয়েছে ঐতিহ্য বহনকারী দুটি গম্বুজ এবং রয়েছে মনোমুগ্ধকর একটি তোরণ। ভেতরে গিয়ে চোখে পড়ে অসাধারণ সব কারুকাজ। কিছু কিছু চুন-সুঁড়কি খসে পড়লেও ছাদের বড় বড় লোহার পাটাতন দেখেই বোঝা যায় হারানো দিনের জমিদার বাড়ির জৌলুস। সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে এখানকার সুউচ্চ মঠগুলো। একটি ভবন ছাড়া অধিকাংশ ভবন একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। জমিদারবাড়িতে এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাওয়ার জন্য সাতটি তোরণ ছিল। এখন টিকে আছে দুটি। তিনটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষও চোখে পড়ে। আনোয়ারার এই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িটির প্রতি পর্যটকরা দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে।
জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকারের সময় স্থাপিত বর্তমান আনোয়ারা থানাও তৎকালীন সরকার এই পরৈকোড়াতেই স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জমিদার যোগেশ চন্দ্র ‘থানার ধারে কানাও ঘেঁষেনা’ এই কথা বলে তা ফিরিয়ে দেন। শিক্ষানুরাগী এ জমিদার এ অঞ্চলের মানুষের লেখাপড়ার উন্নয়নে ছিলেন খুবই আন্তরিক। তিনি পরৈকোড়া ইংরেজী স্কুলকে নয়নতারা উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন।অন্যদিকে এ ইউনিয়নের আরেক প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন প্রসন্ন কুমার রায় বাহাদুর। সংস্কৃতিমনা এ জমিদারের সুখ্যাতি ছিল দুর দুরান্ত পর্যন্ত। চট্টগ্রাম শহরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ও মহেশখালীতে ছিল তার বিরাট জমিদারি। তিনি একাধারে সংস্কৃতিমনা, শিক্ষানুরাগী, প্রজাবৎসল এবং বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। বিশেষ করে তার সংস্কৃতিমনা গুণের কথা সর্বজনবিদিত। তার জমিদারির সময় সুদুর কলকাতা থেকে আসতেন শিল্পীরা। মাসব্যাপী চলত নানারকম সাংস্কৃতিক আয়োজন। প্রজাদের যাতায়াতের সুবিধার্তে তিনি চট্টগ্রাম শহর থেকে পটিয়ার কালারপুল হয়ে আনোয়ারার চানখালী পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণ করেন। বুড়া ঠাকুর দীঘির দক্ষিণ ও পশ্চিম পাড়ের জমিটি তিনিই নয়নতারা উচ্চ বিদ্যালয়ে দান করেছিলেন। ১৩৫০ বাংলা সনের ১২ মাঘ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার বংশধররা দীর্ঘদিন নয়নতারা উচ্চ বিদ্যালয়টি সুনামের সাথে পরিচালনা করেন। এক কথায় এসব প্রজাবৎসল জমিদারদের নানারকম জনহিতকর কাজ- কর্মের কারণে তৎকালে পরৈকোড়া ইউনিয়ন ছিল শিক্ষা দীক্ষা, যোগাযোগ, খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিতে অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে শতগুন এগিয়ে। কিন্তু এসব জমিদারের মৃত্যুর পর সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ না থাকায় তাদের কীর্তিও রেখে যাওয়া সম্পদ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জমিদার বাড়িতে ঘুরতে আসা পর্যটক আল আমিন বলেন, যদি ভালভাবে সংরক্ষণ করে জমিদার বাড়িগুলো বসবাস উপযোগী করে তাহলে এখন মানুষ যে হারে এই জমিদার বাড়িগুলোকে দেখার জন্য যায় বা যাচ্ছে তাহলে ভবিষ্যতে এই বাড়িগুলো প্রাচীন নিদর্শন হিসাবে দেখার জন্য অনেক পর্যটক ছুটে আসবেন বলে আমি মনে করি।









