নওগাঁর নিয়ামতপুরে পাড়া-মহল্লায় দিন দিন রমরমা হয়ে উঠেছে দাদন ব্যবসা। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে দিনমজুর, মধ্যবিত্ত এমনকি ছোট-বড় ব্যবসায়ীরাও আটকা পড়ছে অবৈধ দাদন ব্যবসায়ীদের পাতানো ফাঁদে। বিভিন্ন সমিতি এমনকি ব্যক্তিবিশেষ অধিক মুনাফার লোভে দাদন বা সুদের ব্যবসা করে আসছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বৈধতা নিয়ে ঋণের অনুকূলে মুনাফা গ্রহণ করে আসলেও অনেক ব্যক্তি অধিক লোভের বশীভূত হয়ে অবৈধ পন্থায় সুদের কারবার করে আসছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু শিক্ষকরাও। এমনি দাদন ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে নিয়ামতপুর উপজেলার রামনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ভীম বর্মনের বিরুদ্ধে। সে উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের নরেশ চন্দ্র বর্মনের ছেলে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আড়ালে দাদন ব্যবসা চালিয়ে রাতারাতি ধনী বনে যাচ্ছে। উপজেলার চন্দননগর, ভাবিচা, সদর, শ্রীমন্তপুর, বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দাদন ব্যবসার চাঞ্চল্যকর তথ্য। আর এ দাদন ব্যবসার ফলে সর্বশান্ত হচ্ছে অনেক নিরীহ পরিবার। সংসার নামক জীবনের চাকা সচল করতে গিয়ে সুদের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে অনেকে।
ভুক্তভোগী ভাবিচা ইউনিয়নের সিদাইন গ্রামের সিরাজুল ইসলাম বলেন, দাদন ব্যবসায়ীরা গ্রামের সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কৃষক-শ্রমিকের রক্তচুষে খাচ্ছে। তাদের পাতানো ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে সাধারণ মানুষ গুমরে গুমরে কাঁদে। অনেকে তাদের অত্যাচারে ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করে। তিনি আরও বলেন, আমি বিপদে পড়ে সুদে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিল। দশ হাজার টাকার বিনিময়ে আমাকে ৮০হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এরপরও আদালতে আমার বিরুদ্ধে আড়াই লাখ টাকার মামলা দিয়েছিল। আরেক ভুক্তভোগী শ্রী নয়ন কুমার বলেন, প্রায় প্রতিটা গ্রামেই সুদের কারবার চলে। বিপদে পড়লে মোরা তাদের কাছে যায়। অনেক সময় সুদ ব্যবসায়ীরা ফাঁকা চেকে সই নিয়ে টাকা দেয়। টাকা না দিতে পারলে, চেকে মোটা অংকের টাকা বসিয়ে মামলা দেয়। অনেকে আবার চক্ষু লজ্জার ভয়ে মুখ খোলে না।
আদিবাসী মহিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মোরা হারা বছর কৃষি জমিতে কামলা দিয়া কিছুই করতে পারি না। কোনো রহম পোলা-মাইয়া লইয়া বাঁইচ্ছা থাহি। আর হেরা সুদে টাকা লাগাইয়া রাইতের মধ্যে ধনী অইয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দাদন ব্যবসায়ী বলেন, আমরা সুদে টাকা লাগাই। কেউ বিপদে পড়লে তার পাশে এসে কেউ দাঁড়ায় না। আমরা মানুষের আপদ-বিপদের বন্ধু। তবে যারা এমন অভিযোগ করেছে, যে ফাঁকা চেকে সই নিয়ে টাকা দেয়, তাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে সব শ্রেণির মানুষ খুব সহজে সুযোগ সুবিধা পায় না। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে মুখ চেনার প্রবণতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব, নানা নিয়ম-কানুন আর শর্তের জটিলতায় অনেকের কপালে ঋণ জোটে না। এজন্য দাদন ব্যবসায়ীদের পাতানো ফাঁদে পা বাড়াতে হয় সাধারণ মানুষদের।
শ্রীমন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, এখন মানুষের মধ্যে আগের সেই পারস্পারিক বন্ধন নেই। কেউ কারও বিপদে এগিয়ে আসে না। এমনকি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় ঋণ নিতে গেলে অনেক সময় লাগে। যার ফলে যেকোনো বিপদে-আপদে বা আর্থিক প্রয়োজনে মানুষ বাধ্য হয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের দ্বারস্থ হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুস সালাম বলেন, একজন শিক্ষক কীভাবে দাদন ব্যবসায়ী হতে পারে। সে নৈতিকতার আলো সমাজে ছড়ানোর বদলে মানুষকে ঠকাচ্ছে। উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আছয়াদুল্লাহ বলেন, কোনো ক্লাব বা সমিতির আড়ালে কেউ দাদন ব্যবসা করেছে, কেউ যদি এমন অভিযোগ করে। তাহলে এ ব্যাপারে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক সুফিয়ান বলেন, দাদন ব্যবসায়ীর কবলে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে। যদি কেউ এমন লিখিত অভিযোগ দেয়। তাহলে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।









