ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে চোরের উপদ্রব। শুধু রাত নয় দিনে-দুপুরেও ঘটছে চুরির ঘটনা। খোয়া যাচ্ছে ঘরে রাখা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, বাসাবাড়ির মালামাল। দিনে-দুপুরে চোরেরা হানা দিচ্ছে পৌরসভার ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত বহুতল ভবনের তালাবদ্ধ ফ্ল্যাটে। রাতে হানা দিচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। শীত নামার আগেই চোরের এমন উপদ্রবে আতঙ্ক বিরাজ করছে জনমনে। হয়রানি এড়াতে অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হয় না থানায়।
সূত্র জানায়, গত ১৩ অক্টোবর ভোরে ফজরের নামাজের সময় বিলাসী শপিং কমপ্লেক্সের পাশে অবস্থিত মহু মার্কেটের একটি দোকানের তালা ভেঙে প্রবেশ করে দুই চোর। সে সময় দোকানের ভেতরে থাকা দোকানের লোক চোরদের উপস্থিতি টের পেয়ে চিৎকার করলে চোরেরা দৌঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সে সময় চোরদের একজন পালিয়ে গেলেও অপর চোরকে ধরে ফেলে জনতা। ধৃত চোরটি নিজের গায়ে পরে থাকা দুটি জামার উপরেরটি খুলে ফেলে পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে স্থানীয় জনগণ চোরটিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দেয়। চোরটি তার বাড়ি খুলনায় বলে জানিয়েছে। সে চৌরাস্তা সংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে মাঝে মাঝেই থাকতো বলে একটি সূত্র জানায়।
এদিকে ১১ অক্টোবর বেলা ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি ভবনে চুরি হয়েছে। চোরেরা একটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। ওই ভবনের মালিক আলমগীর হোসেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ভবনের একজন ভাড়াটিয়া সৌদি প্রবাসী সুজন হোসেন। ফ্ল্যাটে সুজনের স্ত্রী অধরা খানম থাকেন। ঘটনার দিন তিনি ফরিদপুর অনুষ্ঠিত একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন। এ সুযোগে ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে চোরেরা ৪০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। একই সময় পার্শ্ববর্তী অপর ফ্ল্যাটের বাসিন্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আজমল হোসেন ও তার পরিবারের কেউ তখন বাড়িতে ছিলেন না। তার ফ্ল্যাটের তালা ভাঙলেও চোরেরা কিছু চুরি করতে পারেনি। সিঁড়ি দিয়ে কারো ওঠার শব্দ পেয়ে চোরেরা পালিয়ে যায়। পরে ওইদিনই নির্বাচন কর্মকর্তা চোরের ভয়ে ওই ভবনের ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়েছেন।
এছাড়া গত ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার পৌর সদরের অডিটোরিয়াম এলাকায় বাড়ির দরজার লক ভেঙে নগদ ৫০ হাজার টাকা ও প্রায় ১২ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করেছে চোরের দল। ওই বাড়ির গৃহকর্তা সবুর খান ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ঘরে তালা দিয়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান। পরে রাত পৌনে নয়টার দিকে বাসায় ফিরে দেখেন বিল্ডিংয়ের দরজার লক ভেঙ্গে চোর ভিতরে প্রবেশ করে আলমারি ভেঙ্গে নগদ ৫০ হাজার টাকা ও প্রায় ১২ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে গেছে। বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে চোরের দল এ দুর্র্ধষ চুরির ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।
এর আগে গত ২৫ ও ২৬ জুলাই তিন বাড়ি এবং এক ওষুধের দোকানে দুর্ধষ চুরি সংঘটিত হয়। ২৫ জুলাই গোহাটা রোডে অবস্থিত কাজী ফারুকের মালিকানাধীন ভবনের তিন ফ্ল্যাটে দিনে দুপুরে চুরি হয়েছে। ওই ভবনের তিন তলার একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া মিম পারভীন ওই দিন সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বাসা থেকে বের হয়ে এক ঘণ্টা পরে বাসায় ফিরে দেখেন ঘরের দরজার তালা ভাঙা। ঘরে থাকা নগদ ৪০ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে চোর। একই ভবনের দুই তলায় ভাড়া থাকেন কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের শিক্ষক মো. ফরহাদ হোসেন। তার ঘরের দরজার তালা ভেঙে ওই দিন একই সময়ে ভরি খানেক ওজনের স্বর্ণালংকার চুরি করে নিয়ে যায় চোর। ফরহাদ হোসেনের সামনের ভাড়াটিয়া মহসীন মিয়ার বাড়িও একই দিন একই সময়ে চুরি হয়।
এর পরের দিন ২৬ জুলাই ভোর পাঁচটার দিকে বোয়ালমারী পৌরসভার স্টেশন রোডস্থ মৃধা ফার্মেসিতে চুরির ঘটনা ঘটে। চোর সাঁটারের তালা ভেঙে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে। পরে সিন্দুকের তালা ভেঙে সিন্দুকে থাকা দুই লক্ষ টাকা নিয়ে চোর পালিয়ে যায়।
গত ১১ অক্টোবর উপজেলা পরিষদের পাশে অবস্থিত যে ভবনে চুরি হয়, সেই ভবনের এক ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া স্কুল শিক্ষক মো. নাজমুল হক বলেন, আমাদের ভবনের পাশের ভবনে মাসখানেক আগে চুরির ঘটনা ঘটায় আমাদের ভবনের কলাপসিবল গেইটে সারাক্ষণই তালা দেয়া থাকে। তারপরও চুরি থামানো গেলো না। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে চিন্তায় থাকি। বাড়িওয়ালাকে বলব বিল্ডিংয়ে সিসিটিভি লাগাতে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় দৈনিক সময়ের প্রত্যাশার সম্পাদক, সরকারি কলেজ রোডস্থ একটি বহুতল ভবনের মালিক লিটু সিকদার বলেন, চোরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় আমি সারাক্ষণই বিল্ডিংয়ের কলাপসিবল গেইটে তালা দিয়ে রাখি, রাতে কলাপসিবল গেইটে ৫টি তালা দেই। আর পুরো ভবনটি ১২টি সিসিটিভির আওতায়। স্থানীয়দের ধারণা দিনে-দুপুরে এসব চুরির পেছনে স্থানীয় এক শ্রেণির দুষ্কৃতকারীও জড়িত। যারা সার্বক্ষণিক বিভিন্ন তথ্য দিয়ে চোরদের চুরিতে সহায়তা করে থাকে। এসব চোর, চোরদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও তথ্যদাতাদের আটক করে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হোক- এমন দাবিই সচেতনমহলের।
বোয়ালমারী থানার সেকেন্ড অফিসার উপ-পুলিশ পরিদর্শক মুহাম্মদ আক্কাস আলী শেখ বলেন, চুরিরোধে আমাদের অভিযান চলমান আছে। এলাকায় যেসব চুরির ঘটনা ঘটেছে সেসব চুরির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেককে আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, মহু মার্কেটে চুরির ঘটনায় আটককৃত চোর খুলনার নান্না মিয়া মৃধা ফার্মেসিতে চুরিতে নিজের সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে।









