সাধারণত বছরের আষাঢ় ও শ্রাবনের বর্ষণে জমিচাষের কাজ শুরু করতো চাষিরা। পর্যায়ক্রমে জমিচাষ, বীজতলা তৈরি, আগাছা নিড়ানো, মই দেয়া ও বীজ রোপনের কাজ শেষ হত ভাদ্রমাসজুড়ে। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। ভরা ভাদ্র শেষ। এখন ও উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলার শতভাগ জমিতে রোপা আমনের কাজ শেষ করতে পারেনি চাষিরা। মৌসুম শেষ প্রান্তে এসে চাষিরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আর দু’চার দিনের মধ্যে এ উপজেলার সমগ্র আবাদি জমিতে রোপা আমনের কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ করেছেন উপজেলা কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, চাষিরা মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মালিয়া গ্রামের চাষি ইসাহাক হাওলাদার ও উত্তর রাজাপুর গ্রামের রাশেদ মিয়া জানান, আষাঢ় ও শ্রাবণের বৃষ্টিতে জমি চাষ ও বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্ত এবার সময় মত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষ শুরু করা যায়নি। অনেকে বিকল্প পানির ব্যবস্থা করে বীজতলা তৈরি করলেও বৃষ্টির অভাবে অধিকাংশ বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়। এবার পানির অভাবে এ উপজেলার চাষিদের স্বাভাবিক চাষ এক মাসের মত পিছিয়ে পড়ে। অধিকাংশ জমি চাষ হয় ভাদ্র মাসের শুরুতে। এতে দেখা দেয় ট্রাক্টর মেশিন ও কৃষি শ্রমিকের সংকট। একই সময় সবার জমি চাষের ব্যস্ততার কারণে ট্রাক্টর ও কৃষি শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাষিদের খরচও বেড়ে যায়।
দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের চাষি নজরুল ফরাজী উত্তর রাজাপুর গ্রামের মাসুদ মীর ও রাজু মৃধা জানান, শেষ সময় চাষের কাজ শেষ করতে গিয়ে দিন প্রতি কৃষিশ্রমিকদের ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরী দিতে হয়েছে।
অন্যান্য বছর স্বাভাবিক সময় যা ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। খাদা গ্রামের কাওছার তালুকদার ও মালিয়া গ্রামের সবুর গাজী বলেন, গত বার প্রতি বিঘা জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর কে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা দিলেও এবার দিতে হয়েছে ২৫০০ থেকে ২৬০০ পর্যন্ত। তারা বলেন, প্রতি বছর আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হত। কিন্তু এবার কাঙ্খিত সময় বৃষ্টি হয়নি। আবার যখন বৃষ্টি হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী হয়ে অনেক জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তাতে তুলনামূলক নীচু জমিতে জলাবদ্ধতার কারনে রোপার কাজ ব্যাহত হয়েছে। কৃষি শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি এবার সার ও ডিজেলের দাম বাড়ায় চাষীরা তাদের চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বলে জানান তারা। গত বারে প্রতি কেজি সার বিক্রি হয়েছে ১৬ টাকা। এবার সরকার নির্ধারন করে দিয়েছেন ২২ টাকা। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে ডিলাররা আরো ৪/৫ টাকা বাড়তি হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী চাষীরা। ফলে ২২ টাকার সার চাষীদের কিনতে হচ্ছে ২৬/২৭ টাকায়।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, এবার এ উপজেলায় ৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার হেক্টর উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ও ৪ হাজার ২৫০ হেক্টরে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার বলেন, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারনে এবার শরনখোলা উপজেলার আমন চাষ কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। আজকের দিন পর্যন্ত এ উপজেলার ৮ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের কাজ শেষ হয়েছে। আর দু'চার দিনের মধ্যে লক্ষ্য মাত্রার শতভাগ অর্থাৎ ৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে রোপনের কাজ শেষ হবে। বিলম্বিত চাষের কারনে ফসলের তেমন কোন ক্ষতি হবেনা বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির ঘটনা ঘটছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে চাষীদের অভিযোজনের জন্য সরকার ও কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর ই আলম সিদ্দিকী বলেন, ভোলা নদী থেকে যাতে লবন পানি ঢুকতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কোন সার ডিলার অনিয়ম বা দূর্নীতি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।









