- গাইবান্ধা-৫ উপ-নির্বাচনে তদন্ত
- তদন্ত টিমের কাছে কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য
গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটায়) আসনের উপনির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিকাংশ প্রিজাইডিং অফিসার অন্যান্য ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা রয়েছেন চাকরি হারানোর আতঙ্কে। তারা বলছেন, ভোটের দিন একটু ভুল ত্রুটি হলেও হতে পারে। তবে তাদের জানামতে আনিয়মের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারপরও যা শুরু হয়েছে তাতে ভয় পাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তদন্ত টিমের কাছ থেকে ফেরা প্রিজাইডিং অফিসারদের অনেকেই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। গতকাল শনিবার তদন্তের শেষ দিনে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুস সোবাহান।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ আসনের উপ-নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ভোট বন্ধ করা হয়। পরে নির্বাচন কমিশন ঘটনা তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। অশোক কুমার দেবনাথের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস, সাহেদুন্বী চৌধুরী গত ১৮ অক্টোবর গাইবান্ধায় আসেন তদন্ত করতে। তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য ৬শ ২২ জনকে হাজির হতে বলা হয়। সেই অনুযায়ী প্রথম দিন প্রিজাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ ১শ ৩৬ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়। তারা সবাই কমিটির কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
তবে নির্বাচন কমিশনের এক বক্তব্যের পর ঘাবড়ে যান অনেকেই। প্রিজাইডিং অফিসার আব্দুল হালিম সাক্ষ্য দিয়ে সার্কিট হাউস থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের মুখে পড়েন। এসময় বলেন, আমরা নিরীহ মানুষ। চাকরি করে বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে বেঁচে আছি। সরকারি আদেশ মানতে গিয়ে লঘুপাপে গুরু দণ্ডের মতো অবস্থা আমার। আমি তো ভয় করছি কি হয় না হয়।
চন্দিয়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদুল হক জানান প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন ব্রহ্মপুত্র নদীর জিগাবাড়ির উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। তিনি বলেন, চাকরি করি কলেজে। বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছি। ভোটে সরকারি দায়িত্ব পালন করলাম। কেন্দ্রে কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিনা দোষে ভোট বন্ধ করা হলো বুঝলাম না। তা না হয় হলো, আমাদের কাছে নানা কথা শুনলেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ভাবগতি দেখে আমরা কী অন্যায় যে করেছি বুঝলাম না।
চর ডাতাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ফারুকুল ইসলাম। তিনি দুর্গম চর পাড়ি দিয়ে ভোট কেন্দ্রে যান। চারদিকে জনশূন্য ভাঙা বেড়ার সেই স্কুলের বেঞ্চে রাতে শুয়ে থেকে পরদিন ভোটগ্রহণ শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটাররা ভিড় জমায় কেন্দ্রে। হঠাৎ ফোন আসে ভোট বন্ধ করার। ভোট দিতে না পারায় লাইনে দাঁড়ানো লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অনেক গালাগাল শুনে ফুলছড়িতে পৌঁছি। কিন্তু কি হলো বলতে পারি না।
ফারুকুল ইসলাম বলেন, আমরা কোনো অন্যায় করিনি। তবু আমাদের হাজির হতে হলো। নির্বাচন কমিশন যা বলছে, তাতে আমরা ভয়ে আছি। এই ভয় শুধু আমার নয়, আমার পরিবারের সকলের ওপর প্রভাব পড়েছে। টেলিভিশন দেখে দেখে বাড়ির বউ ছেলে মেয়েরা চিন্তায় নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়েছে। আমি শুধু সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছি। কিছু হলে পরিবারের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলতে পারবো না।
পুলিং এজেন্ট হিসেয়ে দায়িত্বপালনকারী খয়বর হোসেন বলেন, পুলিশ না ধরলেই হলো। সাক্ষী দিলাম সব সত্য কথা। তারপরও আমার যদি কিছু হয় তাহলে আর ভোট কেন্দ্রে কোনো দিন যাবো না। ভয়ে ভয়ে বলেন, ভাই হামাক কি পুলিশ ধরি নিয়া যাবে? আমি তো কিছুই জানি না।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী অ্যাডভোকেট গোলাম শহীদ রঞ্জু বলেন, বেলা যতো বাড়তে থাকে নৌকা মার্কার লোকজন কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে থাকে। এসব দেখে আমরা চার স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ এর জাহাঙ্গীর আলম, স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নির্বাচন বর্জন ঘোষণা দেই। তিনি আরও বলেন, তাদের এই অপকর্ম তো নির্বাচন কমিশন ঢাকায় বসে দেখেছে। যখন কন্ট্রোল করা যায়নি- তখন কমিশন ভোট বন্ধ করে দেয়।
সরকারিদলের মনোনীত প্রার্থী মাহমুদ হাসান রিপন বলেন, কোথাও কোনো গোলমাল, সংঘর্ষ ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ইভিএমে ভোট নির্ভরযোগ্য। তাছাড়া তিনি দাবি করেন, যেসব কেন্দ্রের ভিডিও ফুটেজে অনিয়ম ধরা পড়েছে সেসব স্থগিত করা হোক। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সব ভোট বন্ধ করা হলো। অন্য ভোট কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার দাবি জানান তিনি।
গত ১৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নির্বাচন কমিশনের তদন্ত গত ২০ অক্টোবর শেষ হয়েছে। আগামী সোমবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানান তদন্ত দলের প্রধান অশোক কুমার দেবনাথ।









