- বরাদ্দ কমছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা
- বিদেশি অর্থায়ন কমছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি
নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে যতটা উৎসাহী দেখা যায় প্রকল্প শেষ করার ক্ষেত্রে তেমন কোনো তাগিদ দেখা যায় না: অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন
করোনা সংক্রমণের মধ্যে ওমিক্রনের ধাক্কায় গতি কমেছে উন্নয়ন কার্যক্রমের। ফলে ধীর হয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন। তাই সময়মতো বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব বিবেচনায় নিয়ে এডিপি সংশোধন করে বরাদ্দ কমানো হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৩০ শতাংশ। যেখানে শুধু জানুয়ারিতে আগ্রগতি ৬.১৫ শতাংশ। এখন বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ১৭ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ কমছে ১৯ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা বা প্রায় ৮.২৯ শতাংশ।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে সংশোধিত এডিপি নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। আজ বুধবার পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন পাবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
এবারের এডিপিতে বৈদেশিক অংশ ছিল ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে বৈদেশিক অর্থায়ন কমে হচ্ছে ৭০ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থায়ন কমছে ১৭ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। সরকার প্রতিবারই শতভাগ এডিপি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে প্রতিবছরই অর্থ বছরের শেষভাগে এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করা হয়।
এডিপির বরাদ্দ হ্রাসের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবছর অবাস্তব একটা লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু হয়। চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘসূত্রতার সমাধান না করেই প্রতি একনেকে নতুন নতুন প্রকল্প নেয়া হয়। নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে যতটা উৎসাহী দেখা যায় প্রকল্প শেষ করার ক্ষেত্রে তেমন কোন তাগিদ দেখা যায় না।
সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাওয়া ১০টি প্রকল্পের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। যেখানে এডিপির তুলনায় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয় কমছে। প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। মাতারবাড়ী ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিকাল কোল পাওয়ার প্রজেক্ট প্রকল্পে সংশোধিত এডিপিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রকল্পটিতে বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা।
এরপর তৃতীয় অবস্থানে থাকা চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এখানে মূল এডিপির তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৮৫ কোটি টাকা। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ সংশোধিত প্রকল্পটিতে এডিপিতে ৬ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে বরাদ্দ বেড়েছে ২ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। এরপর ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) প্রকল্পে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এখানে বরাদ্দ কমেছে ৫৬৭ কোটি টাকা।
এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রথম পর্যায়ে প্রথম সংশোধিত প্রকল্পে ৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেখানে বরাদ্দ বেড়েছে ৬৪৫ কোটি টাকা। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পটিতে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যেখানে বরাদ্দ কমেছে ৮০০ কোটি টাকা।
সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প
এলেঙ্গা হাঁটিকুমরুল রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। যেখানে বরাদ্দ কমেছে ২০৬ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। যেখানে বরাদ্দ কমেছে এক হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। আর ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর প্রকল্প সাপোর্ট টু ঢাকা সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস নির্মাণ প্রকল্পে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। যেখানে বরাদ্দ বেড়েছে ৪৭৫ কোটি টাকা।
সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১০টি সেক্টরের মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ। এ সেক্টরে বরাদ্দ কমছে ৫ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। এরপরই সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকায় কোন পরিবর্তন হয়নি। গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলি সেক্টরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সেক্টরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য সেক্টরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। যেখানে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কমছে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ১ হাজার ৫৩৪টি প্রকল্প। নতুন অনুমোদিত পাওয়া প্রকল্প রয়েছে ১৯৯টি। তাছাড়া চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নেই এমন বাদ পড়া ২১টি প্রকল্পসহ সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৭৫৪টি প্রকল্প বরাদ্দসহ এনইসির অনুমোদনের জন্য তোলা হবে।









