ট্যুরিস্ট ভিসার নামে বাংলাদেশ থেকে নারী পাচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারের একটি নিরাপত্তা সংস্থাঅনুসন্ধান করে দুই শতাধিক তরুণীর পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিটের নথি সংগ্রহ করেছে, যাদের প্রত্যেকেই গত এক বছরে কমপক্ষে তিনবার ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে এক থেকে তিন মাস করে থেকেছেন। ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে ড্যান্স বারে নাচের কাজে যুক্ত হচ্ছেন তরুণীরা। এসব তরুণীর বেশির ভাগের বয়সই ২৫ বছরের মধ্যে। তাদের নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র।
নিরাপত্তা সংস্থাটি জানায়, স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে সুন্দরী নারীদের প্রলোভনে ফেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ড্যান্স বারে সরবরাহ করছে চক্রটি। এ চক্রের অধীনে পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশী নারী এসব দেশের বিভিন্ন বারে কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে ঢাকার বেশ কয়েকটি ট্র্যাভেল এজেন্সিরও। রাজধানীর নয়াপল্টন, কাকরাইল ও মতিঝিলে অবস্থিত এসব ট্র্যাভেল এজেন্সির মূল কাজ ভ্রমণ ভিসায় যাওয়া তরুণীদের টিকিট থেকে শুরু করে নির্বিঘ্নে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অতিক্রমের ব্যবস্থা করা। আর এ কাজে সহায়তার জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের একটি সিন্ডিকেটকে জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে মাশুল দেয় তারা। এসব তরুণীর টিকিট ক্রয় ও বিমানবন্দর পার করার সব খরচ বহন করে বিদেশের ড্যান্স বার ও হোটেলের মালিকপক্ষ।
অনুসন্ধানে এরই মধ্যে প্রায় ৩৫ জন স্থানীয় এজেন্টের পরিচয় পেয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাটি। তাদের মধ্যে দুজন নারী পাচারে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, গত এক বছরেই শুধু তাদের মাধ্যমেই বিদেশের ড্যান্স বারে কাজ করে এসেছেন প্রায় ৫০০ তরুণী।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক তৌহিদ-উল আহসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ভ্রমণ ভিসা নিয়ে তরুণীরা বিদেশের ড্যান্স বারে কাজ করছে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। আর ভ্রমণ ভিসায় কে কোন দেশে কতবার ভ্রমণ করছেন, সেটি ইমিগ্রেশন বিভাগ দেখে। কোনো যাত্রী ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় থাকছেন কিনা সেটার তথ্যও ইমিগ্রেশনের কাছে থাকে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে, এর মধ্যে বেবিচক একটি অংশ কেবল। পাচারের মতো সিন্ডিকেটে বেবিচকের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছেও এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। গতকাল সন্ধ্যায় দায়িত্বে থাকা শাহজালাল বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে গিয়ে প্রতিনিয়তই যাত্রীরা যাওয়া-আসা করছেন। এর মধ্যে নারী যাত্রীও যেমন যান, পুরুষ যাত্রীও তেমন যাচ্ছেন। কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন, সেটা তো বোঝা সম্ভব নয়। এছাড়া কোনো যাত্রীর কাছে যদি বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও ভ্রমণের আনুষঙ্গিক সব নথি থাকে, তখন তাকে ইমিগ্রেশনে আটকানোর কোনো কারণ নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের অন্যান্য সংস্থা থেকে যদি কোনো যাত্রী বা পাসপোর্টের তথ্য দেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।
জানা যায়, বিমানবন্দরের টাকাটা লেনদেন হয় ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে। ঢাকার পল্টন ও কাকরাইল এলাকার তিনটি ট্র্যাভেল এজেন্সি এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। হোটেল মালিকদের পাঠানো অ্যাডভান্স থেকে বিমানবন্দরের টাকাটা অনিক ও সোহাগের মতো এজেন্টরাই ট্র্যাভেল এজেন্সিকে দিয়ে আসে এবং এখান থেকেও মাথাপিছু তাদের ২ হাজার টাকা কমিশন দেয় ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলো।
ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) মহাসচিব আবদুস সালাম আরেফ বলেন, কোনো যাত্রীর যদি বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা থাকে, তবেই কেবল এজেন্সিগুলো টিকিট বিক্রি করতে পারে। এখানে যাত্রীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী, সেটা কিন্তু ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর পক্ষে বের করা সম্ভব নয়। তবে কোনো ট্র্যাভেল এজেন্সি যদি জেনে-বুঝে এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, সে ক্ষেত্রে সেটা অপরাধ। এক্ষেত্রে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।









