এর আগে বন্ধ হয়েছে সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল
রাখাইনে যুদ্ধ পরিস্থিতি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে টেকনাফ স্থলবন্দরের সীমান্ত বাণিজ্যে। বন্ধ হয়ে গেছে টেকনাফ স্থলবন্দরে হয়ে মায়ানমারের মন্ডুর সাথে আমদানি রপ্তানি। মায়ানমার জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) সংঘর্ষের ভয়াবহতা বেড়েই চলছে। এদিকে নিরাপত্তার কারণে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় গত সপ্তাহ থেকে রাখাইনের জেলা শহর মংডু থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে পণ্য আসা আপাতত বন্ধ থাকায় সীমান্ত বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। একইভাবে এপার থেকেও কোনো পণ্য যাচ্ছে না মন্ডু শহরে। মংডুর অবস্থান টেকনাফের উল্টো পাশে নাফ নদীর ওপারে। টেকনাফ স্থলবন্দর থেকে শহরটির দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার।
টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য অচল হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখন ৪০০ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের বিভাগীয় বন্দর নগর আকিয়াব (সিথুয়ে) থেকে পণ্য আনতে হচ্ছে তাঁদের। এতে সময় ও ব্যয় বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আকিয়াব টেকনাফ পথেও পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি ট্রলারে করে মংডু থেকে নারকেল, পেঁয়াজ, আদা, আচার, কাঠ,কাঁচামাছ ও বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য আসতো টেকনাফ স্থলবন্দরে। ৭/৮ দিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে। আবার আকিয়াব থেকেও আগের মতো পণ্য আসছে না। স্বাভাবিক সময়ে সেখান থেকে ১০–১২টি ট্রলারে নানা ধরনের পণ্য আসত টেকনাফ স্থলবন্দরে। গত রবিবার এসেছে মাত্র ২টি ট্রলার। এর আগের দিন এ সংখ্যা ছিল তিন।
টেকনাফ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিনুর রহমান বলেন, সংঘর্ষের কারণে মংডুর পরিস্থিতি থমথমে। ফলে সেখান থেকে ট্রলারে করে পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। তবে আকিয়াব বন্দর থেকে কিছু ট্রলার বঙ্গোপসাগর হয়ে সেন্ট মার্টিনের জলসীমানা দিয়ে টেকনাফ স্থলবন্দরে আসছে।
‘আমদানি-রপ্তানিতে অঘোষিত বিধিনিষেধ’
শুল্ক বিভাগ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্যমতে, সীমান্ত চোরাচালান নিরুৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফ ও মিয়ানমারের মংডুর সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করেছিল। মিয়ানমারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বন্দরে আমদানি পণ্যে ভাটা পড়েছে উল্লেখ করে টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মো. লুৎফুল হক বলেন, এতে করে রাজস্ব আদায়ও কমছে।
গত রবিবার সকালে বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, একটি ট্রলার থেকে হিমায়িত মাছের কার্টুন খালাস করছেন শ্রমিকেরা। ট্রলারটিতে ৪০ টন রুই, কাতলা মাছ আছে বলে জানান আমদানিকারক ও টেকনাফের ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম। স্থলবন্দরে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা রাখাইন রাজ্যের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, মংডু শহরে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে কঠোর কড়াকড়ি চলছে। হাটবাজারে লোকসমাগম করতে দেওয়া হচ্ছে না। বিকেল চারটার পর দোকানপাট বন্ধ রাখা হচ্ছে। সড়কে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী ও বিজিপি।
মংডু থেকে উত্তর দিকে তুমব্রুরাইট পর্যন্ত (এপারে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম) ৩৭ কিলোমিটারের মংডু-ঢেকুবনিয়া সড়কে যান চলাচল বন্ধ আছে। সড়কের পূর্ব পাশের বিভিন্ন পাহাড়ে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ঘাঁটি গেড়ে মিয়ানমারের সেনা ও সীমান্তচৌকিকে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। ওই ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, প্রচণ্ড গোলাগুলির কারণে টেকনাফ বন্দরে পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আমদানি-রপ্তানিতে অঘোষিত বিধিনিষেধ চলছে। আকিয়াব ও ইয়াঙ্গুন থেকেও মংডুতে পণ্যসামগ্রী আনা যাচ্ছে না।
বর্ডার পাস’ বন্ধ ছয় বছর
শুল্ক ও বিজিবি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের তিনটি সীমান্ত ছাউনিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) সীমান্ত বাণিজ্যের ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের তিন দিনের বর্ডার পাস (সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি) এবং দুই পারের (টেকনাফ ও মংডু) লোকজনের যাতায়াতের এক দিনের ট্রানজিট পাস বন্ধ করে দেয়। নানা অজুহাতে সেটা আর চালু করা হয়নি।
স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বরে মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়েছে ১১৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দামের ১ কোটি ৪৮ লাখ কেজি ওজনের পণ্য। আর একই সময় বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা দামের ৭৬ হাজার কেজি ওজনের আলু ও গার্মেন্টস পণ্য।
স্থলবন্দরের পরিচালন সংস্থা ইউনাইটেড ল্যান্ডপোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এখন মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে আমদানি করা হচ্ছে কাঠ, হিমায়িত মাছ, সুপারি, আচার, নারকেল, আদাসহ বিভিন্ন পণ্য। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হচ্ছে আলু, গার্মেন্টস পণ্য, মানুষের মাথার চুল ও চিপস।
টেকনাফ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বলেন, রাখাইন রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। কিন্তু বর্ডার পাস বন্ধ থাকায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেখানে গিয়ে বাজার তৈরি করতে পারছেন না। ফলে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমে আসছে। বাড়ছে ঘাটতির বাণিজ্য।
বান্দরবানের ঘুমধুম এবং কক্সবাজারের হোয়াইক্যং ও পালংখালী সীমান্তের মানুষ গোলাগুলির শব্দ শুনতে পায়নি। তবে ওপারে মংডু ও তার পাশের বুচিডং শহরে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। একাধিক সূত্রমতে, গত কয়েকদিনের সহিংসতায় বুচিডং শহরের তিনটি গ্রামের অন্তত ৮০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।ভরা পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিন দ্বীপে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা। জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রজ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (স্কোয়াচ) সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন, নাফ নদী দুই দেশের সীমারেখা ভাগ করে দিয়েছে। নাফ নদী হয়েই পর্যটকবাহী জাহাজগুলো সেন্ট মার্টিনে যাতায়াত করে।
তাছাড়া নাফ নদীর বদরমোকামসহ বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক ডুবোচর জেগে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ চলাচল উচিত হবে না। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টেকনাফের পরিবর্তে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ সরাসরি সেন্ট মার্টিনে যাতায়াত করবে। তবে মিয়ানমার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল শুরু হবে। আগে এ নৌপথে চলাচল করত ১০টি প্রমোদতরি।
একাধিক মায়ানমারের সীমান্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দিন দিন রাখাইন রাজ্যসহ বিভিন্ন প্রদেশে সেনাবাহিনীর সাথে আরকান আর্মির মধ্যে চলছে তুমুল লড়াই। চরম নিরাপত্তাহীন সাধারণ নাগরিকেরা রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালাচ্ছে। ফলে চরম খাদ্য সংকটে পড়তে যাচ্ছে রাজ্যবাসী। হত্যা, গুপ্ত হত্যা,অগ্নিসংযোগ, গোলা বর্ষণের কারণে শহর,গ্রাম রাখাইন রাজ্যসহ ৭টি প্রদেশে চলছে ব্যাপক সংঘর্ষ। এসব যুদ্ধাঞ্চল ক্রমাগত ভাবে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে মায়ানমার ভিক্তিক গণমাধ্যম ইরাবতী তথ্য প্রকাশ করেছেন।









