সেবাবঞ্চিত ২০ লক্ষাধিক মানুষ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বন্ধ হওয়ার ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি পার্বতীপুর-রমনা বাজার রুটে নিয়মিত চলাচলকারী শতবর্ষী রমনা লোকাল ট্রেন। এতে এ অঞ্চলের মধ্য ও নিম্নবিত্ত যাত্রীরা স্বল্প ভাড়ায় চিলমারী, রংপুর ও পার্বতীপুর হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি রেলওয়ে স্টেশন ঘিরে খেটে খাওয়া কুলি-মজুর, রিক্সা-ভ্যান চালক ও চা-পান বিক্রেতাগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খেয়ে-না খেয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
রাজারহাটের সুপারি ব্যবসায়ী মাহাবুব হোসেন, সিংগারডাবরির রাজা, জলিল, সৈয়দ আলী, মিন্টু, সদরের শামসুজ্জামান সুজা, দুর্গাপুরের মনছের আলি, উলিপুরের ফুলমিঞা, মুকুল, মোজাম্মেল, মজিবর ও বাচ্চু মিয়া বলেন, আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কম খরচে রমনা লোকাল ট্রেনে তিস্তা, রংপুর, বদরগঞ্জ, পার্বতীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কাঁচা ও মজাসুপারি বুক করে পাঠিয়ে লাভবান হতাম। তবে ট্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় সড়ক পথে বেশি ভাড়া দিয়ে এসব মালামাল পাঠাতে গিয়ে আমরা লাভের মুখ দেখতে পারছি না। বরং লোকসান হচ্ছে।
এছাড়া পাঁচপীর বাজারের চাটাই ব্যাবসায়ি হজরত আলী, হাছেন আলি, আইয়ুব আলি, মহুবর ও উমর আলী একই কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা প্রতিহাটে রমনা লোকাল ট্রেনে ৫০০ থেকে ৬০০ মণ করে চাটাই বুকিং করতাম। কিন্তু এখন চরম ভোগান্তিতে আছি।
পাঁচপীর রেলওয়ে স্টেশনের তৎকালীন বুকিং সহকারি আল-আমিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চাটাই বুকিং এর সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, চাটাই-সুপারি ছাড়াও প্রতিদিন এ ট্রেনে করে কলাসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি পার্বতীপুর-বদরগঞ্জ হতে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন স্টেশনে আসতো এবং ট্রেনটি ফেরার সময় অনেক ধরনের মালামাল নিয়ে যেত। সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সকল ব্যবসায়ীগণ অবিলম্বে ট্রেনটি চালুর জোর দাবি করেন।
গেল বছরের ২৪ মার্চ দুপুরে রমনা লোকাল ট্রেনটি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার রমনা বাজার স্টেশন থেকে পার্বতীপুর স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার পর অদ্যবধি আর ফিরে আসেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯২৮ সালের আগস্ট মাসে চিলমারী থেকে প্রথম রেল যোগাযোগ চালু হয়। তিস্তা থেকে রমনা পর্যন্ত ৫৭ কি.মি. রেলপথের ৪৩ কি.মি. রেলপথ পড়ে কুড়িগ্রামের ভিতরে। যাত্রীদের সুবিধার্থে কুড়িগ্রামের ৪৩ কি.মি. রেলপথের মধ্যে ৮টি রেলস্টেশন স্থাপন করা হয়। ব্রহ্মপুত্রের ব্যাপক ভাঙ্গনে চিলমারী রেলস্টেশন নদে বিলীন হওয়ার পর পার্বতীপুর-রমনা বাজার রুটে দুটি এবং লালমনিরহাট-রমনা বাজার রুটে দুটিসহ মোট ৪টি ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। কিন্তু ২০০২ সালের দিকে আকস্মিকভাবে পার্বতীপুর-রমনা বাজার রুটে একটি এবং লালমনিরহাট-রমনা বাজার রুটে দুটিসহ মোট ৩টি ট্রেন বন্ধ করে দেয়া হয়। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনও তুলে নেয়া হয়। তারপর থেকে একমাত্র রমনা লোকাল ট্রেনটি পার্বতীপুর-রমনা বাজার, রমনা বাজার-তিস্তা, তিস্তা-রমনা বাজার ও রমনা বাজার-পার্বতীপুর রুটে নিয়মিত চলাচল করলেও করোনার কারণে বন্ধ হওয়ার পর ২০ মাসেও আর চালু হয়নি। রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার যুগ্ম আহব্বায়ক শামসুজ্জামান সরকার সুজা বলেন, রমনা লোকাল ট্রেনটি কুড়িগ্রামের নিম্নআয়ের মানুষের যাতায়াতের প্রাণ। আমরা দীর্ঘদিন থেকে রমনা লোকাল ট্রেন চালুসহ দ্বিতীয় ধাপে তিস্তার পরিবর্তে রংপুর গিয়ে ফিরে আসার দাবিতে আন্দোলন করে আসছি এবং ডিআরএম, জিআইবিআরসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদনও করেছি। তারপরও রমনা লোকাল ট্রেন চালু না করায় এটি চিরতরে বন্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষের গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছি। তিনি অবিলম্বে রমনা লোকাল ট্রেন চালুসহ ২য় ধাপে রমনা-তিস্তা ও তিস্তা-রমনা'র পরিবর্তে রমনা-রংপুর এবং রংপুর-রমনা রুটে চলাচলের দাবি জানান।
গণকমিটির সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও কলামিস্ট নাহিদ হাসান নলেজ বলেন, করোনাকালীন সময়েও দফায় দফায় সারাদেশে ২০ সেট লোকাল ট্রেন চললেও দারিদ্রপীড়িত কুড়িগ্রামে রমনা লোকাল ট্রেনটি না চালানো আরেকটি ষড়যন্ত্র। তিনি রেল বিভাগের এ নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানান।
গত ১৯ আগস্ট থেকে করোনার কারণে বন্ধ থাকা দেশের প্রায় সকল ট্রেন চালু হলেও রমনা লোকাল ট্রেনটি এখনো চালু হয়নি। অবিলম্বে ট্রেনটি চালুর দাবীতে কুড়িগ্রাম জেলাবাসি, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, টিম কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, রমনা লোকাল ট্রেন বাস্তবায়ন কমিটি ও মাদকমুক্ত সমাজের ব্যানারসহ কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রায় সহ্স্রাধিক মানুষ রংপুর এক্সপ্রেসের কানেক্টিং শাটল ট্রেন অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
লালমনিরহাট বিভাগিয় রেলওয়ে ম্যানেজার শাহ সূফী নূর মোহাম্মদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে রমনা লোকাল ট্রেনটি বন্ধ থাকলেও চালুর এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা রমনা লোকাল ট্রেনটি চালানোর চেষ্টা করছি।
বাজার/এম.আর








