ইতিহাস-ঐতিহ্য
রংপুরের গঙ্গাচড়ার প্রাচীন নিদর্শন কলি আমিন জামে মসজিদ। উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের মিয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত এ মসজিদের আরবি হরফে লেখা ফলক দেখে এলাকাবাসী নিশ্চিত হয়েছে, বংলা ১২৪৮ সালে এটি নির্মিত হয়। প্রয়োজনের তাগিদে এলাকাবাসী মসজিদের সামনে সম্প্রতি সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও পুরনো মসজিদটি প্রাচীনকীর্তি হিসেবে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কথিত আছে বড়বিল ইউনিয়নের মিয়াপাড়া গ্রামের কলি আমিন ও দলি আমিন নামে দুই ভাই বাস করতেন। তাদের উদ্যোগেই এ মসজিদটি নির্মিত হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি। মসজিদের ভেতরে কারুকার্যখচিত অসংখ্য নকশা রয়েছে। অথচ একটি নকশার সঙ্গে আরকটি নকশার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ মসজিদের নির্মাণ কাজ করেছেন ১৩ জন মিস্ত্রী। কিন্তু মিস্ত্রীদের খাওয়ানোর সময় খুঁজে পাওয়া যেত ১২ জনকে। লোকজনের ভাষায় তারা বিশ্বকর্মা নামে অভিহিত ছিল। আরো শোনা যায়, মসজিদের ভেতরে কারুকার্যখচিত যে নকশাগুলো রয়েছে তা একটি বিশাল আকৃতির কড়াইয়ে ঘি ঢেলে তাতে ভেজে নেওয়া হতো। এখনো বিশাল আকৃতির সেই মাটির কড়াই মসজিদ নির্মাতাদের উত্তরসূরিদের বাড়িতে রয়েছে। আজও অনেক কৌতূহলী আগন্তুক কড়াইটি দেখার জন্য তাদের বাড়িতে ভিড় করেন।
সরেজমিনে মিয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ওই সময়ের বিশাল আকৃতির কড়াইটি রয়েছে বদরুল আলম পেয়ারার বাড়িতে। দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন ঐতিহাসিক এ কড়াইটি দেখার জন্য তার বাড়িতে আসেন। ষাটোর্ধ পেয়রা জানান, মৃত শাহাদৎ মিয়ার চার ছেলের মধ্যে তিনি ছাড়া বাকি তিনজন মারা গেছেন। তার দাদা ছিলেন দানেশ মামুদ। আর দানেশ মামুদের দাদা ছিলেন কলি আমিন। যার নামে প্রাচীন ওই মসজিদের নামকরণ হয়েছিল।
বদরুল আলম পেয়ারা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এলাকার মুরুব্বিজনের কাছে ওই মসজিদের ইতিহাস শুনে আসছি। আমার পূর্ব পুরুষরা মসজিদটি নির্মাণ করেছেন শুনে গর্ববোধ করি।’
কলি আমিন জামে মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন মিয়াপাড়া এলাকার আজিমুদ্দিন মিয়া (৭০)। তিনি বলেন, প্রাচীন এ মসজিদের নির্মাণশৈলী এমন যে, অন্য কোনো প্রাচীন নিদর্শনের সঙ্গে এর কোনো মিল খঁজে পাওয়া যায় না। ভেতরের কারুকাজ এখনও মসজিদ নির্মাণের সেই ইতিহাস সকলকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই মসজিদের মুসল্লী হতে পেরে গর্ববোধ করে তিনি জানান, মসজিদের পাশ দিয়ে চলে গেছে গঙ্গাচড়া-বড়াইবাড়ি পাকাসড়ক। পথচারি অনেকে কৌতুহলের বশে প্রাচীন এ মসজিদে নামাজ আদায় করেন। তারা এর ইতিহাস জেনে মুগ্ধ হন।
স্থানীয় লোকজন জানান, গঙ্গাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের মিয়াপাড়ায় ১২৪৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হলেও ১৩০৪ সালের ঐতিহাসিক ভূমিকম্পে এর অনেকাংশ মাটির নিচে দেবে যায়। কিন্তু এটি সংস্কার করা দুঃসাধ্য ছিল বলে মুসল্লিরা তখন থেকে ওই অবস্থাতেই মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছিলেন। ভূমিকম্পে মটির নিচে দেবে যাওয়া এ মসজিদের জানালাগুলো মাটির সঙ্গে লেগে গেছে। দরজাগুলো খাটো হয়ে যওয়ায় মসজিদে প্রবেশ করতে অনেক কষ্ট হয়। বর্তমানে গঙ্গাচড়ার এ প্রাচীন মসজিদটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। যে কোনো সময় রয়েছে দুর্ঘটনার আশংকা। প্রয়োজনের তাগিদে এলাকাবাসী সম্প্রতি মসজিদের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, পুরনো মসজিদটি সংস্কার করা সম্ভব নয়। সে কারণে এটিকে নষ্ট না করে এর সামনে নির্মিত হচ্ছে সম্প্রসারণ ভবন। প্রাচীন কীর্তি হিসেবেই থেকে যাবে গঙ্গাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের ঐতিহাসিক কলি আমিন জামে মসজিদ।
আনন্দবাজার/এম.আর









