বাংলাদেশি ছেলে তুহিন ময় বিশ্বাস তমু। আর রাশিয়ান মেয়ে আয়না বিশ্বাস। দুজন বেড়ে উঠেছেন আলাদা দেশে। সংস্কৃতির ভিন্নতায় বিকাশ হয় দুজনার। তবে আজ একজন আরেকজনকে ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারেন না। ভালোবেসে বিয়ে করেছেন। সংসার করছেন ৩৩ বছর ধরে।
সংসার আলোকিত করে এসেছে দুই কন্যা সন্তান। একজন আনিতা বিশ্বাস এবং অন্যজন ক্যামেলিয়া বিশ্বাস।
দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও স্ত্রী, সন্তানদের কাছে বাঙালি সংস্কৃতিকে পরিচিত করেছেন। বাংলাদেশকে ধারণ করেন বিদেশে জন্মগ্রহণ করা ও বেড়ে উঠা সন্তানরা। বাবার মতো করে বাংলাদেশকে ভালোবাসেন। দেশের সম্মান বাড়াতে প্রতিনিয়ত কাজ করছেন প্রবাসে বেড়ে উঠা বাংলাদেশি এই দুই মেয়ে।
দুজনার ‘সাংস্কৃতিক ভিন্নতা’ রয়েছে-একসঙ্গে কিভাবে মানিয়ে নিয়েছেন? জানতে চেয়েছিলাম আয়না বিশ্বাসের কাছে। তিনি বলেন, ভালোবেসে বিয়ে করেছি। আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনার ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রয়েছে। বোঝাপড়াটাও বেশ ভালো। এই বেশ ভালো আছি। সুখী সংসার আমাদের বললেন তিনি।
আয়না বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রেমে এতটাই পড়েছেন যে নিজের মেয়েদের বিয়ে দিতে চান বাংলাদেশে। স্বামী হিসেবে বাংলাদেশি ছেলেরা খুব ভালো হয় বলে জানালেন। আশ্চর্য হয়ে একজন বিদেশিনীর মুখে সাবলীল বাংলায় কথা বলতে পেরে এবং বাংলাদেশের প্রশংসা শুনে বেশ স্বস্তি লাগছিল!
এই দম্পতির বড় মেয়ে আনিতা বিশ্বাস বাংলা বলেন ভাঙা ভাঙা শব্দে। তবে বাংলাদেশকে ভালোবাসেন মনপ্রাণ উজাড় করে। ‘বাংলাদেশি মেয়ে’ বলে ডাকলে খুশির ঝলক দেখা যায় মেয়েটার মুখে। কথা প্রসঙ্গে নিজের হাত দেখিয়ে বললেন, ‘আমার শরীরে বাংলাদেশের রক্ত। ভালোবাসি প্রিয় বাংলাদেশ।’
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করে বিভাগের সেরা সুন্দরী হয়েছেন।
রাশিয়ার বালাসিকা শহরে ইন্টারন্যাশনাল কালচার কনফারেন্সে ৩০টি দেশের মধ্যে ফোক গানে আনিতা বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।
আনিতা বিশ্বাস জানালেন, বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক উন্নয়নে অবদান রাখতে চান তিনি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কালচার এবং সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহ রয়েছে।
ছোট মেয়ে ক্যামেলিয়া বিশ্বাস বাংলাদেশি সংস্কৃতিকে একটু বেশিই ধারণ করেন। বাংলাদেশে ফিরতে চান পড়াশোনা শেষ করে। জানালেন, রাশিয়ার মাটিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে চাই আমি। বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে কাজ করব।
এমন কন্যাদের নিয়ে গর্ব করতেই পারেন রাশিয়ার মস্কোতে বাস করা তরুণ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ তুহিন ময় বিশ্বাস। তিনি বললেন, বাংলাদেশ আমার আবেগের জায়গা। দেশ নিয়ে সবসময় গর্ব করি-আমরা বীরের জাতি। ভবিষ্যতে দেশের মানুষের পাশে থেকে সেবা করতে চান তিনি।
এবার একটু পেছনে ফেরা যাক। তুহিন ময় বিশ্বাস তমু জন্মগ্রহণ করেন নেত্রকোনার স্বনামধন্য বিশ্বাস পরিবারে। বাবা কমরেড ডা. মৃনাল কান্তি বিশ্বাস। তিনি ছিলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের অগ্রযোদ্ধা। তাঁর নেতৃত্বেই সংগঠিত হয় উত্তর ময়মনসিংহ তথা তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমায় ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরে নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নামেন মৃনাল কান্তি বিশ্বাস। এজন্য তাকে তত্কালীন মোশতাক সরকার গ্রেফতার করে। সেই সময় তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সঙ্গে ময়মনসিংহ জেলে বন্দি ছিলেন।
তুহিন ময় বিশ্বাস তমুর এসএসসি নেত্রকোনার দত্ত হাই স্কুল থেকে এবং এইচএসসি নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে। পরে মেধাবী এই ছাত্র রাশিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ান সাহিত্য থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।
তুহিন ময় বিশ্বাসের মা নারী সংগঠক বিভা রাণী বিশ্বাস। বড় ভাই ছবি বিশ্বাস নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। আরেক ভাই চন্দন বিশ্বাস যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিরোধ যোদ্ধা। কলমাকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঁচ ভাই দুই বোনের মধ্যে তুহিন ময় বিশ্বাস সর্বকনিষ্ঠ।








