কাঁধে ঝুলছে ব্যাগ। ব্যাগে রয়েছে ছোট শিশি, কটন, অলিভ ওয়েল তেলসহ নানা রকমের সরঞ্জাম। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ঘুরছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা। ছোট আকারের একটি যন্ত্র হাতে নিয়ে কটন বার আর অলিভ ওয়েল তেল মিশিয়ে করছেন কান পরিষ্কার। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় । এখানে বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তি নিয়মিত কান পরিস্কার করছেন। তার কাছ থেকে ট্রেন যাত্রী, মধ্য ও নিন্ম আয়ের লোকজন এ কাজ নিয়মিত করছেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে মানুষের কান পরিষ্কারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বাবুল উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামের ইউছুব আলীর ছেলে। বর্তমানে তার সংসারে ৪ ছেলে ২ মেয়ে সহ ৮ জন সদস্য রয়েছে। ফুটপাতে কান পরিস্কার করা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক চিকিৎসক জানান, কান মানুষের জীবনের একটি খুবই গুরুত্ব পূর্ণ অঙ্গ। তবে কান পরিষ্কার রাখা প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। কান নিয়ে কোন অবহেলা করতে নেই। আসলে যারা ফুটপাতে বসে বা হাটে বাজারে ঘুরে কান পরিষ্কার করেন তাদের কাছ থেকে পরিস্কার করা ঠিক নয়। এতে বড় ধরণের বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারণ তারা কোন প্রকৃত চিকিৎসক নন। তাছাড়া তাদের কাছে যে চিকন শিক থাকে, সেটি জীবাণুমুক্ত নয়। কানে খোঁচাখুঁচির কারণে পর্দা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেইসঙ্গে কানে ইনফেকশন ও হতে পারে। কান পরিস্কার করতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের মাধ্যমে করা উচিত।
বাবুল মিয়া বলেন, অভাব অনটনের কারণে তিনি পড়া লেখা তেমন করতে পারেনি। সংসারের হাল ধরতে ১৫ বছর বয়সেই তাকে এ কাজে নামতে হয়েছে। মূলত এ কাজ তার পিতার কাছ থেকে হাতে খড়ি। তার পিতা দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর এ পেশায় কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই পিতার সাথে বের হয়ে হাট বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কিভাবে টিমটা ধরতে হয়, কানের ভেতরে ময়লা শক্ত হয়ে জমাট বেধে থাকলে বা কানের ভেতরে চাল, ধান, পোকা, ঢুকে গেলে কিভাবে তা বের ও পরিস্কার করতে হয় ওইসব সহ নানা কলা কৌশলগুলো শিখেন। এক পর্যায়ে নিজেই শুরু করেন কান পরিষ্কার করার কাজ। সেই থেকে তিনি এ পেশায় কাজ করে আসছেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত স্টেশন এলাকায় ঘুরে মানুষের কান পরিষ্কার করে দৈনিক ৪শ থেকে ৫শ টাকা আয় হয় বলে জানায়। ওই টাকা দিয়ে চলছে তার সংসার। বর্তমানে এটি হচ্ছে তার একমাত্র পেশা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন। তিনি আরও বলেন, এ কাজ করতে গিয়ে এখন পযর্ন্ত কোনো ধরণের অঘটন ঘটেনি। চেষ্টা করি নিখুত ভাবে কাজ করতে। তিনি বলেন, এটা হল প্রকৃত পক্ষে মানবসেবা, কান পরিষ্কার করার পর যে যা আমাকে দেন তাই নিয়ে যাই। তবে এ কাজে নিচে ২০ টাকা উপরে ১শ টাকার বেশি কেউ দিতে চাই না। এক সময় ট্রেনে চড়ে কান পরিষ্কারের কাজ করতাম। এখন আর ট্রেনে কোথাও যাওয়া হয় না। রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কান পরিষ্কারে কাজ করছি।
রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন যাত্রী আজগর আলী বলেন, গত প্রায় ৩ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন সময় কান পরিস্কার করছেন। যখন কান পরিস্কার করেন তখন ভালো লাগে। মাসে অন্তঃত ১ বার তিনি কান পরিস্কার করছেন বলে জানায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জসিম মিয়া বলেন, তার কানে প্রায় সময় ময়লা জমে থাকে। মাসে অন্তঃত একবার হলেও তার কান পরিষ্কার করতে হচ্ছে। অপরিষ্কার থাকলে প্রতিনিয়ত কান চুলকাতে থাকে। এতে খুবই অস্বস্তি লাগে। তাই কান পরিষ্কার করা। বাবুল বলেন, আমাদের কাছে মূলত ট্রেন যাত্রী, মধ্য ও নিম্ন আয়ের লোকজন বেশি আসে। খুব কম সংখ্যক শিক্ষিত লোকজন আমরা পাই। সব কিছুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, আমাদের কাজের দাম বাড়ে নাই।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার হিমেল খান বলেন, ফুটপাতে বা হাটে বাজারে ঘুরে যারা মানুষের কান পরিস্কার করছেন তাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ওইসব লোকদের কাছ থেকে পরিস্কার করা ঠিক নয়। কারণ কান হলো একটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর ভেতর নরম ও মসৃণ পর্দা রয়েছে। প্রকৃত চিকিৎসক ছাড়া পরিস্কার করতে গিয়ে কোন কারণে এ পর্দায় আঘাত প্রাপ্ত হলে কান শ্রবণশক্তি হারানোর সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া কানের মতো নরম মসৃণ স্থানে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করলে তা যে কোন সময় বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা রয়েছে।









