সুন্দরবনের পরই বৃহৎ প্রাকৃতিক বনভূমি
পরিবেশের রং বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মানুষ ও জীবজগতের জীবন। পরিবেশ প্রতিকূল হলে জীবের ধ্বংস ও বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানুষ, অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী-জীবনের বিকাশ ঘটে। পৃথিবীর বয়স বাড়ছে আর আস্তে আস্তে যৌবন হারাচ্ছে পরিবেশ। এ পরিবেশই প্রাণের ধারক, জীবনীশক্তির বাহক। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ ও প্রাণীর অস্তিত্ব নির্ভর করেছে পরিবেশের ওপর। পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে রয়েছে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। কিন্তু মানুষের চরম অবহলো ও অসচেতনতার কারণে পৃথিবীর পরিবেশ এখন হুমকির মুখে। পরিবেশ হুমকির মুখে হলে মানবসভ্যতাও হুমকির কবল থেকে বাঁচবে না।
প্রকৃতির এক অনবদ্য উপহারের নাম রেমা-কালেঙ্গা বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। সৌন্দর্যে, সৌকর্যে, সম্পদে, প্রাচুর্যে, জীববৈচিত্র্যে ও নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ এক বনখণ্ডের নাম রেমা-কালেঙ্গা বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। এটি তরপ হিল রিজার্ভের অন্তর্গত একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত। সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বনভূমি এটি। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন এ অভয়ারণ্যের একদিকে ভারতীয় সীমান্ত ও অন্য তিনদিকে বিস্তৃর্ণ চা বাগানে ঘেরা। চা-বাগানের সৌন্দর্যমযতা যেমন বিরল মাধুর্যমণ্ডিত করেছে এ বনকে, তেমনি এর বৈচিত্র্যময় উপাদান সমুহের আলংকারিক নান্দনিকতা অনন্য।
রেমা কালেঙ্গা অভয়ারণ্য বেশ কিছু বিরল ও বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বর্তমানে এ বনে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা-লতাগুল্ম পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পাখির জন্য এ বন সুপরিচিত এবং এদের মধ্যে রয়েছে ভীমরাজ, টিয়া, পাতি ময়না, লালমাথা কুচকুচি, সিপাহি বুলবুল, রাজ ধনেশ, শকুন, কালো মথুরা, লাল বনমোরগ, প্যাঁচা, মাছরাঙ্গা, ঈগল, চিল প্রভৃতি। এ বনে তিনপ্রজাতির বানরের বাস, এগুলো হলো- উল্টোলেজি বানর, লাল বানর ও নিশাচর লজ্জাবতী বানর। তাছাড়া এখানে পাঁচ প্রজাতির কাঠবিড়ালী দেখা যায়।
মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে প্রকৃতি হতে বিলুপ্তির পথ ধরেছে প্রকৃতি বান্ধব বন্যপ্রাণী। বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম হলো 'শকুন'। শকুনকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখলেও প্রকৃতিতে রয়েছে শকুনের অপরিসীম প্রয়োজনীয়তা। বাংলা সাহিত্যে ও বিনোদন মাধ্যমে শকুনিকে চিহ্নিত করা হয়েছে নেতিবাচক দৃষ্টিতে। শকুন সংরক্ষণে ‘বাংলাদেশ জাতীয় শকুন সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। ২০১৪ সালে দেশের দু’টি অঞ্চলকে শকুনের জন্য নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে শকুনের প্রজননকালীন বাড়তি খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্য হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ও সুন্দরবনে দু’টি ফিডিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
সূত্রমতে, বাংলাদেশে ৭ প্রজাতির শকুন আছে। এরা সবাই হুমকির মুখে। লাল মাথা শকুন ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন দেশে শকুনের সংখ্যা মাত্র ২৬০টির কাছাকাছি আছে বলে ধারনা করা হয়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে শকুনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা। শকুনের জন্য হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা ও সুন্দরবনে দুটি সেইভ জোন ঘোষণা করেছে সরকার। শকুন সংরক্ষণের বিষয়ে আমাদের দেশে তিনটি জরিপ করা হয়েছে। এদিকে শকুনের জন্য খুব উপকারী দুইটি ওষুধ বাজারে এসেছে। বন অধিদফতর কর্তৃক দিনাজপুরের সিংড়া ন্যাশনাল পার্কে শকুনের জন্য রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যতম গহীন বন রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমে শকুনের আবাস ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা করেছে বন বিভাগ। বাংলাদেশের হারিয়ে যেতে বসা শকুনের নিরাপদ আবাস্থল ও প্রজনন এলাকা হিসেবে এ বনকে তফশিলভূক্ত করা হয়েছে। এখানে এখনো প্রায় ৬৫-৭০ টির মতো শকুন বসবাস করছে। ওটঈঘ বাংলাদেশ ও বনবিভাগ যৌথভাবে এ শকুন সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
লোভ আর হিংস্রতা বোঝাতে যে প্রাণীটির উদাহরণ দেয়া হয়, সেটা 'হায়েনা'। রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকার ঊষর লাল মাটিতে উনিশ শতকের শেষের দিকেও ঘুরে বেড়াত ধূসর হায়েনার দল। তবে এখন বরেন্দ্র তো বটেই, বাংলাদেশের কোথাও হায়েনা নেই। একসময় এ দেশে গণ্ডারও ছিল। গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে এমন ৩১ প্রজাতির প্রাণী। দেশের এক হাজার ৬১৯ প্রজাতির বন্য প্রাণীর কোনটির কী অবস্থা, সে-বিষয়ক লাল তালিকা বা রেড লিস্টের হালনাগাদ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে সরকারের বন বিভাগ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)। ১৫ বছর পর করা এই প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন তালিকায় দেখা যায়, দেশের ৩৯০টি বন্য প্রাণী কোনো না কোনোভাবে বিপন্ন।
আইইউসিএন বিশ্বব্যাপী একই পদ্ধতি ব্যবহার করে এবারই প্রথম প্রাণিকুলের অবস্থা-বিষয়ক প্রতিবেদন বা রেড লিস্ট তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে এই তালিকা দুই বছর ধরে ২০০ জন বিজ্ঞানী মিলে চূড়ান্ত করেছেন। ২০১৬ সালের জুন মাসের শেষার্ধে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণিকুলের অবস্থার একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকায় দেখা যায়, গত ১৫ বছরে পাখি প্রজাতি সবচেয়ে বেশি বিলুপ্ত হয়েছে। দেশের ৫৬৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে ১৯টি গত ১০০ বছরের বেশি সময়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থান স্তন্যপায়ী প্রাণীদের। ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী হারিয়ে গেছে এই সময়ে। আর সরীসৃপজাতীয় প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে একটি।
বর্তমান সময়ে পরিবেশ বিরাট একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জীবনের যা কিছু সুখ, দুঃখ, ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সবকিছুর মধ্যেই পরিবেশের বিরাট একটা ভূমিকা রয়েছে। আমরা সেটা হয়তো অনেক সময় দেখতে ও শুনতে পাইনা। দেখতে ও শুনতে চাইলেও অনেক সময় বিশ্বাস করতে চাই না। বিশ্বাস করলেও আমারা সেইভাবে কাজ করতে চাই না। পরিবেশ রক্ষা এবং পরিবেশকে প্রতিপালন, লালন-পালন করে নিয়ে যাওয়া আমাদের প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধটা জাগ্রত করা অতি জরুরি।।
লেখক: সাংবাদিক
আনন্দবাজার/শহক









