করোনার প্রভাবে গত কয়েক মাসে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন রাজধানীর লাখ লাখ মানুষ। কাজ হারিয়েছেন গৃহ শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক থেকে শুরু করে সব খাতের শ্রমজীবীরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে বড় ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের চাকরিজীবি সকলেই সম্মুখীন হচ্ছেন আর্থিক টানাপোড়েনে।
সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় কিছু নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্যের সংস্থান হলেও তারা দিতে পারছেন না ঘরভাড়া। যার ফলে গত তিন মাসে অসংখ্য পরিবার রাজধানী ছেড়ে চলে গেছেন গ্রামে। কয়েক মাসের ঘরভাড়া দিতে না পেরে অনেকেই মালপত্র রেখেই চলে গেছেন। কেউ যতটুকু মালামাল নেওয়া সম্ভব তা নিয়ে পালিয়ে গেছেন রাতের আঁধারেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় জমানো শেষ সম্বলটুকু খরচ করে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন কেউ কেউ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন শুধু ‘টু-লেট’ এর ছড়াছড়ি। গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া কমিয়ে হলেও ভাড়াটিয়া রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কর্মহীন হয়ে পড়ায় সেই সামর্থ্যও নেই অনেকের।
রাজধানীর ভাটারা থানাধীন ছোলমাইদ এলাকায় একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায় তিন বেডরুমের ১৫ হাজার টাকার ‘ব্যাচেলর’ ফ্ল্যাটে সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে থাকছেন মাত্র একজন। দুই মাস আগেও তাকে ভাড়া দিতে হতো পাঁচ হাজার টাকা। কাজ না থাকায় ভাড়া কমিয়েও অপর দুজনকে রাখতে পারেননি বাড়িওয়ালা।
এদিকে গত দুই মাসে এই এলাকা থেকেই শতাধিক পরিবার ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। অনেকেই ভাড়া বকেয়া পড়ায় মালপত্র রেখে পালিয়ে গেছেন। ভাটারার ছোলমাইদ ও বসুমতি এলাকার টিনশেড ঘরগুলোতে বসবাস মূলত গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও নির্মাণ শ্রমিকদের। এর মধ্যে কিছু রিকশাচালক টিকে থাকলেও করোনার কারণে কাজ হারিয়েছেন অধিকাংশ গৃহকর্মী ও নির্মাণ শ্রমিক।
ওই এলাকার বাড়িওয়ালা হাজী বদরউদ্দিনের আটটি ভাড়াটিয়া পরিবার গত তিন মাসে ঘর ছেড়েছে। বদরউদ্দিন জানান, বটগাইছ্যাবাড়ি এলাকায় তার টিনশেড ভাড়া ঘর থেকে করোনা পরিস্থিতির শুরুতেই তিনটি পরিবার ভাড়া না দিয়ে চলে গেছে। তাদের ঘরগুলোতে তেমন কোনো মালামালও ছিল না। এ ছাড়া বালুর মাঠ এলাকায় তার টিনশেড ভাড়া ঘর থেকে আরও চার ভাড়াটিয়া ঘরে তালা দিয়ে চলে গিয়েছিল। গত মাসে তাদের দুজন এসে অনুনয়-বিনয় করায় ৩-৪ হাজার টাকা মওকুফ করে ছেড়ে দেন।
কুড়িলের কুড়াতলি এলাকায় চারজন একটি কক্ষ সাড়ে তিন হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে থাকতেন। তিনজনের সঙ্গে থাকেন একটি সুপার শপের কর্মচারী মাসুম। অন্যজন ফুটপাথে কাপড় বিক্রি করেন। বাকি দুজন রাজমিস্ত্রির সহকারী (নির্মাণ শ্রমিক)। কাজ না থাকায় এপ্রিলের শুরুতে জামালপুরে গ্রামের বাড়ি চলে যান নির্মাণ শ্রমিক দুজন। ফোন করলে নির্মাণ শ্রমিক দুজনই টাকা পাঠাতে অপারগতা জানান। বাধ্য হয়ে অপর দুজন কিছু টাকা জোগাড় করে বাড়িওয়ালাকে শান্ত করেন। মে মাসের মাঝামাঝি আকস্মিক সুপার শপের চাকরিটি হারান মাসুম। এরপর থেকে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কাজের আশায়। মাসুম বলেন, এখন যে ঘরভাড়া পরিশোধ করে বাড়ি চলে যাব সেই টাকাই নেই। কী খাব, কী করব?
এদিকে শেষ সম্বল খরচ করে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। অনেকেই ভাড়া কমাতে ফ্ল্যাট বাসা ছেড়ে উঠছেন শহর থেকে দূরে টিনশেড ঘরে। বড় ফ্ল্যাট ছেড়ে উঠছেন ছোট ফ্ল্যাটে। এমনই একজন হাফিজ উদ্দিন চলতি মাসেই উত্তরার ভাড়া বাসা ছেড়ে প্রায় অর্ধেক ভাড়ায় উঠেছেন উত্তরখানে একটি টিনশেড ঘরে। গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ করেই একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মের সিনিয়র এক্সিকিউটিভের চাকরিটি হারান তিনি।
আনন্দবাজার/ডব্লিউ এস









