- হেঁটে-বাইসাইকেলে সমাবেধে
- হামলা সংঘর্ষ ভাঙচুর
শত বাধা উপেক্ষা করে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার বিএনপির নেতাকর্মী খুলনা বিভাগীয় জনসমাবেশে উপস্থিত হয়েছে। গত শুক্রবার রাত থেকেই সমাবেশস্থল ছিল উত্তাল। বাস, লঞ্চ বন্ধের পরে বন্ধ করে দেওয়া হয় নদীর খেয়া পারাপার। তারপরেও থ্রি হুইলার ও ট্রলার যোগে এসে সমাবেশে যোগদেন মানুষ। এমনকি বাইসাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটেও খুলনায় আসেন অনেকেই। থাকেন নগরীর ফুটপথে। পথে পথে ক্ষমতাসীনদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ভাঙচুর হয়েছে রেলস্টেশনসহ অফিস-যানবহন। আহত হয়েছেন অনেকেই।
এদিকে বাস-লঞ্চ-খেয়া পারাপার বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। গত শুক্রবারের সমাজ সেবা অধিদপ্তরের নিয়োগ পরিক্ষায় অংশগ্রহণকারী অনেকেই বাড়ি ফিরতে না পেরে শহরে থাকতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে রোগী ও স্বজনরা। পূর্ব ঘোষিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেয়া হয় প্রতিনিয়ত ৩০/৪০ হাজার মানুষ চলাচলের রূপসা ঘাটের পারাপার।
গোপালগঞ্জ থেকে আসা হাজী মজনু সরদার বলেন, আমার মেয়ে একটি ক্লিনিকে ভর্তি। অপারেশন করা হবে। কষ্ট করে ঘাট পর্যন্ত এসে পার হতে পারছি না। রূপসার নাসিমা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, দৌলতপুর ডে নাইট কলেজে আমার পরীক্ষা রয়েছে। যেতে না পারলে পরীক্ষাতো বাতিল করবে না। যেভাবে হোক যেতে হবে। ঘাট পার হতে পারলে কোনো একটা ব্যবস্থা হয়তো করতে পারতাম। তবে ঘাট বন্ধ থাকায় বিপদে পড়েছি।
নগরীর বৈকালীতে গতকাল শনিবার বেলা ৩টার দিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ১৪নং ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে। এখানে আহত হয়েছে অন্তত ১৫ জন। এছাড়া শিববাড়ী মোড়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে দুটি মটর সাইকেল ভাঙচুর করা হয়েছে।
খুলনা শহরে বিভিন্ন প্রবেশমুখে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে অবস্থান নেন প্রতিপক্ষ নেতাকর্মীরা। প্রবেশপথগুলোতে লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান করেন তারা।
যারাই খুলনায় প্রবেশ করেছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বাদ যাচ্ছে না সাংবাদিকরাও। তাদের বহনকারী গাড়ি আটকিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ভাঙচুর করা হয়েছে রেলস্টেশনেও। বিএনপির সমাবেশে আগতদের বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে খুলনা রেল স্টেশনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মুখোমুখি অবস্থান নেয় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ সময় বিএনপি কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাট ছোঁড়ে এবং স্টেশনের দরজার গ্লাস ভাঙচুর করে। তাদের অভিযোগ সমাবেশে যেতে বাধা দেয়া হচ্ছিল।
খুলনা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার জানান, নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটির জের ধরে সংঘর্ষে জড়ায় আগতরা। এক পর্যায়ে তারা স্টেশনের গ্লাস ভাঙচুর করে। কেএমপি অতিরিক্ত উপ কমিশনার সোনালী সেন জানান, কাউকে বাধা দেয়া হয়নি। ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার সকাল থেকে নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে দেখা যায় কাঁটাতারের বেড়া। খুলনার গণসমাবেশে আগত বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, শহরে ঢুকতে যে ঘাট পারাপার রয়েছে সেটা বন্ধ করা হয়েছে। এমনকি গণসমাবেশের প্রবেশপথ পিকচার প্লেস মোড়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। কাঁটাতারের বেড়ার ব্যাপারে কর্তব্যরত পুলিশের এসআই মাহফুজ বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে পারেন।’
এদিকে গত শুক্রবার থেকে খুলনামুখী বাস ও লঞ্চ বন্ধ। রাত থেকে বন্ধ হয়ে নগরীর নৌঘাটগুলো। ভৈরব ও রূপসা নদীর সবগুলো ঘাটে ট্রলার চলাচল বন্ধ রাত থেকে। সারাদেশের সঙ্গে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে খুলনা নগরী। এতো বাধার মুখে পড়ে ‘বিচ্ছিন্ন’ নগরীতে ভোর থেকে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। বেলা বাড়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিলও বাড়তে থাকে। খুলনা মহানগরী রূপ নেয় মিছিলের নগরীতে।
সমাবেশস্থলে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। সমাবেশের সামনে স্থান না পেয়ে নেতাকর্মীরা আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান নেয়। নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ ফেরিঘাট মোড় থেকে খানজাহান আলী সড়ক, পাওয়ার হাউজ মোড়ের দুই পাশে শেরে বাংলা রোড ও জব্বার স্মরণীতে অবস্থান নেন।
নড়াইল বিএনপি’র কর্মী মোহাম্মদ সেলিম বাইসাইকেল যোগে এসে বিভাগীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তার বাড়ি জেলার শাহবাগ ইউনিয়নে জুরালিয়া গ্রামে। শুক্রবার সকাল সাত টায় তিনি খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৫০ কিলোমিটার দূরের খুলনা নগরীতে আসতে সময় লাগে ৭ ঘণ্টা।
কয়রা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বলেন, বাধা কখনো জনস্রোত আটকাতে পারে না। একশ’ কিলোমিটার নদীপথ ট্রলার যোগে পাড়ি দিয়ে কয়রা থেকে মানুষ এসেছে। এছাড়া আগে থেকেই অনেকে শহরে এসে অবস্থান করেন। নগরীর সোনাডাঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইকবাল হোসেন বলেন, পুরো খুলনা শহর পুরোটা জুড়েই শুধু মিছিল। খুলনা আজ মিছিলের নগরীতে রূপ নিয়েছে।
সমাবেশের মঞ্চের ঠিক মাঝখানে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মানে একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা। সবুজ তোয়ালে দিয়ে ঢাকা চেয়ারের এক পাশে সমাবেশের প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চেয়ার। আরেক পাশে সমাবেশের সভাপতি খুলনা নগর বিএনপির আহবায়ক এস এম শফিকুল আলম মনার চেয়ার।
বড় মিছিল নিয়ে বিভাগীয় গণসমাবেশে যোগ দেন খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনিসহ বিএনপির সাবেক নেতারা।
দুপুর ১২টায় নগরীর সঙ্গীতা সিনেমা হলের মোড় থেকে বড় মিছিল নিয়ে তারা সমাবেশস্থলে যান। মিছিলে খুলনা মহানগর বিএনপি, নগরীর ৫ থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ওয়ার্ড কমিটির সাবেক নেতারা অংশ নেন। প্রায় ১১ মাস পরে দলের কোনো মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিলেন তারা।
২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর খুলনা মহানগর বিএনপির ৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হলে বাদ পড়েন মঞ্জু ও তাঁর অনুসারীরা। দলের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ ডিসেম্বর তাঁকে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, নির্বাচনকালীন সরকার, জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পুলিশের গুলিতে নেতাকর্মী হত্যা, হামলা ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে গণসমাবেশের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। কেন্দ্রীয় এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের পর শনিবার খুলনা বিভাগীয় শহরে দলটির তৃতীয় গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত সময়ের পৌনে দুই ঘণ্টা আগে নগরীর ডাকবাংলো মোড়ে দুপুর ১২টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়।









