ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খামারগাঁও গ্রামে একটি বাঁশঝাড়ে হাজার হাজার বক ও পানকৌড়ির মিলন মেলা বসেছে। এখানে প্রায় চারমাস নির্বিঘ্নে অবস্থান করে পাখিরা। প্রজননকার্য সম্পন্নের পর বাচ্চা ফুটিয়ে বড় হওয়ার পর বাঁশঝাড় ত্যাগ করে বক-পানকৌড়ি। এভাবেই গেল বারো বছর ধরে পাখিগুলো প্রাকৃতিক বৈচিত্র বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
নান্দাইল উপজেলার চন্ডীপাশা ইউনিয়নের খামারগাঁও গ্রামের মৃত আব্দুল আওয়াল মাষ্টার এবং তাঁর বাড়ি লাগোয়া ভাতিজা আবু তাহেরের বাড়ি। বাড়ির পিছনেই ঘন সন্নিবেশিত বাঁশঝাড়। প্রায় ১২ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের বক ও পানকৌড়ি ওই বাঁশঝাড়ে এসে নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তুলছেন। পাখিগুলো প্রতিবছর জুন মাসে আসা শুরু করে সেপ্টেম্বর চলে যায়। এ ক’মাস এদের কল-কাকলিতে এলাকাটি মুখরিত হয়ে উঠে। পথচারিরা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পাখিদের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। গ্রামের মানুষের অতি সতর্কতার কারণে পাখি শিকারীরা এখানে আসতে পারেনা। বাসাতৈরি থেকে শুরু করে ডিমপাড়া, বাচ্চা ফুটানো এবং বাচ্চা বড় করা এসব কাজে চারমাস তাদের এখানে অবস্থান করতে হয়। প্রতিবছর একই সময় তারা আবাও ফিরে আসেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সন্ধ্যার দিকে দলবেঁধে পাখি ফিরে আসছে বাঁশঝাড়ে। এসময় পাখিদের কলরবে মুখরিত হয়ে উঠে। বাঁশঝাড়ের কাছে গিয়ে দেখা যায় প্রতিটি বাঁশে একই সঙ্গে ৬ থেকে ৮টি বক ও পানকৌড়ির বাস। বাঁশঝাড়ের নিচে পাখিদের বিষ্টা ও পালক পড়ে আছে। স্থানীয়রা জানায়, পাখিগুলো ভোরে দল বেঁধে দূর-দূরান্তের জলাশয়ে ছোট ছোট মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। আবার সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসে। তবে কখনো ওই এলাকার আশেপাশের পুকুর বা মৎস্য খামার থেকে পাখিগুলো মাছ শিকার করেনা।
এ বিষয়ে নান্দাইল সমূর্ত্ত জাহান মহিলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অরবিন্দ পাল অখিল বলেন, বর্ষাকাল এসব পাখিদের প্রজননকাল। এসময় প্রতিটি স্ত্রী বক ৩ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। ২১-২৫ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। আর বাচ্চাগুলো স্বাবলম্বী হতে সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ দিন। অন্যদিকে একটি স্ত্রী পানকৌড়ি ৪ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা হতে ২৭ থেকে ৩০ দিন লাগে। ৩৫ থেকে ৪০ দিনে বাচ্চা উড়তে শিখলেও স্বাবলম্বী হতে সময় লাগে ৩ মাস। ‘প্রজনন মৌসুমে বক ও পানকৌড়ি একই সঙ্গে একই গাছে পরপর কয়েক বছর বাসা তৈরী করে। সাধারণত স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তার কথা ভেবে বাচ্চা নিয়ে অন্য কোথাও যায় না। সম্ভবত পাখিগুলো ওই এলাকাটিকে নিরাপদ মনে করে বলেই প্রতিবছর আসে।
বাড়িটির বর্তমান মালিক আউয়াল মাষ্টারের স্কুলশিক্ষক ছেলে আতিকুর রহমান মিলন বলেন,‘পাখিগুলো দীর্ঘদিন এখানে অবস্থান করলেও কারোর কোনো ক্ষতি করে না। বরং জমির বিষাক্ত পোকামাকড়ও ছোটছোট সাপ খেয়ে উপকার করছে। তাছাড়া বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসা যে খাবারগুলো পাখিদের মুখ থেকে নিচে পড়ে যায় সেগুলো হাঁস-মুরগীসহ বিড়াল কুকুর ও বিভিন্ন পোকমাকড়ের খাদ্য হচ্ছে। পুকুরে পড়া বিষ্টা মাছ খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করছে। এ কারণে বাড়তি কোন খাদ্য দিতে হচ্ছেনা। চন্ডীপাশা ইউপি চেয়ারম্যান এমদাদুল হক ভূইয়া বলেন, কয়েক বছর ধরেই পাখিগুলো আসছে। সবাইকে বলে দিয়েছি কেউ যেন এসব পাখির কোন ক্ষতি করতে না পারে সে দিকে নজর রাখতে।
আনন্দবাজার









