- জুলাইয়ে জানা যাবে মোট জনসংখ্যা
- বন্যাদুর্গত এলাকায় গণনা বিঘ্নিত
সারাদেশে গত ১৫ জুন একযোগে শুরু হয় জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রম। তবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলায় বন্যা শুরু হওয়ায় এসব জেলায় জনশুমারি কার্যক্রম চরমভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এ অবস্থায় জনশুমারি সফল করতে এসব এলাকায় সাতদিন বৃদ্ধি করা হয় শুমারির মেয়াদ। ফলে ২৮ জুন পর্যন্ত সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনা জেলায় চলে জনশুমারি। এর মাধ্যমে শেষ হলো দীর্ঘ ১১ বছর পর অনুষ্ঠিত কাঙ্ক্সিত জনশুমারি।
এবারই প্রথম সারাদেশে ডিজিটাল জনশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। ফলে জুলাই মাসে জানা যাবে দেশের মোট জনসংখ্যার হিসেবে। এই সময়ে একটু পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে পুরোদমে কাজ করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিবিএস জানায়, এক সপ্তাহ সময় বৃদ্ধির কারণে পুরো সিলেট বিভাগেও আশানুরুপ জনশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে জানা যাবে দেশের মানুষ কত? দেশে গৃহ কত? এছাড়া কত জন বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করে এবং কত জন বাংলাদেশী নাগরিক বিদেশে অবস্থান করে সকল তথ্য জানা যাবে।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন জানান, দেশের মানুষের সঠিক তথ্য দিতে আমরা সবাই সচেষ্ট ছিলাম। সবাই এক যোগে কাজ করেছি। যেখানে গণনাকারী যায় নি আমি নিজে চেক করে সেখানে গণনাকারী পাঠিয়েছি। আমাদের কাজ দেশের মানুষের সঠিক হিসেব দেয়া। অনেকে বলেন আমার বাসায় গেল না ওর বাসায় গেল? আমাদের কাজ কিন্তু মানুষের সংখ্যার হিসেব বের করা। কাজের কারণে অনেকে থাকতে পারেনি তাই আমরা অন্য খানা থেকে তথ্য নিয়েছি। আমাদের গণনাকারী একাধিক বার গেছে। এছাড়া আমরা কিন্তু হেল্প ডেস্ক চালু করেছি। যাদের তথ্য নেয়া হয়নি তারা যেন তথ্য দিতে পারে। সব মিলিয়ে একটা যুগোপযোগী জনশুমারি দিতে আমরা কোন ত্রুটি রাখিনি।’
দেশের অন্যান্য জেলায় জনশুমারির কাজ শতভাগ শেষ হলেও বন্যাদুর্গত চার জেলায় তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এক সপ্তাহ সময় বৃদ্ধি করে শুমারি সফল করা হয়েছে। এবারের শুমারিতে ডিজিটাল ডিভাইস ট্যাবলেট ব্যবহার করে কম্পিউটার অ্যাসিসটেড পারসোনাল ইন্টারভিউং (সিএপিআই) পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সহজে ও সুনির্দিষ্টভাবে শুমারির গণনা এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং কোনো খানা গণনা থেকে বাদ না পড়া বা একাধিকবার গণনা না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ও গুগল সমন্বয় করে ডিজিটাল ম্যাপ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ম্যাপ ব্যবহার করে সাময়িকভাবে নিযুক্ত গণনাকারীরা প্রায় তিন লাখ ৭০ হাজার নির্ধারিত গণনা এলাকার প্রতিটি বাসগৃহ, খানা ও ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করেন।
ডিজিটাল এ শুমারি বাস্তবায়নে সারাদেশে একযোগে তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার হয় তিন লাখ ৯৫ হাজার ট্যাবলেট। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত ট্যাবলেটসমূহ মোবাইল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট (এমডিএম) সফটওয়্যার ব্যবহার করে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এছাড়া মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে গাজীপুর কালিয়াকৈরে স্থাপিত বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (বিডিসিসিএল) টায়ার আইভি সিকিউরিটি সমৃদ্ধ ডেটা সেন্টার ব্যবহার করা হয়। মাঠপর্যায় থেকে বিডিসিসিএল হয়ে বিবিএস সার্ভারে আসার পূর্ব পর্যন্ত সংগৃহীত সব তথ্য-উপাত্ত গোপন অবস্থায় থাকবে, যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এছাড়া একটি ওয়েবভিত্তিক ইন্টিগ্রেটেড সেনসাস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইসিএমএস) প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শুমারির যাবতীয় কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। তাছাড়া এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম রিয়েল টাইম মনিটর করা হয়। সর্বোপরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ফলে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সহজতর হয় এবং স্বল্পতম সময়ে শুমারির প্রতিবেদন প্রকাশ সম্ভব হবে।
দেশে ১০ বছরে গড়ে বাড়ে দুই কোটি মানুষ
পরিসংখ্যান আইন ২০১৩ অনুযায়ী আদমশুমারিকে ‘জনশুমারি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। জনশুমারি ও গৃহগণনা বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পরিচালিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপকভিত্তিক পরিসংখ্যানিক কার্যক্রম। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৫ লাখ। দ্বিতীয় আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮১ সালে, সেসময় মোট জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৯৯ লাখ।
এরপর ১০ বছর পর পর দেশের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা যথাক্রমে ১৯৯১, ২০০১ ও ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে ১১ কোটি ১৫ লাখ, ২০০১ সালে ১৩ কোটি ৫ লাখ ও ২০১১ সালে সর্বশেষ ১৪ কোটি ৯৮ লাখ জনসংখ্যা ছিল। গত শুমারিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রতি ১০ বছরে গড়ে প্রায় দুই কোটি বেড়েছে। এবারও এমনই হতে পারে। দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ বাড়তে পারে।
দেশের মানুষের সংখ্যা কত হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এটা এখন বলা যাবে না। দুই একদিনের মধ্যে একটা রিপোর্ট তৈরি করা হবে। এই রিপোর্ট আমাদের সরকারপ্রধানকে দেখানো হবে। তিনি আমার বস তিনি যেদিন নির্দেশ দেবেন সেদিন শুমারির তথ্য প্রকাশ করা হবে। আপনাদের ডেকে জনশুমারির তথ্য প্রকাশ করবো। এবার ডিজিটাল জনশুমারি হয়েছে আশা করছি দ্রুত সময়ে তথ্য দেবো।
একনেক সভা পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অনেকের বাসায় গণগাকারি যায়নি বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিকরা। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এবার লিখার কিছু ছিল না, জাস্ট টেবে ক্লিক করলেই হতো। তাও অনেকের মাঝে কাজ না করার প্রবণতা ছিল। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা লোকদের নিয়োগ করা হয়েছিল। সম্মানি ভাতাও বেশি দেয়া হয়েছিল। তারপরেও অনেক জাগায় কাজ হয়নি, বলেও স্বীকার করে নেন মন্ত্রী।
আনন্দবাজার/শহক









