জলবায়ু পরিবর্তনের থাবায় বাড়ছে বজ্রপাত
১ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বজ্রপাত বাড়ছে ১২ ভাগ
হটস্পট মধ্যাঞ্চল
দায়ী আর্দ্রতা, ঝড়োমেঘ উষ্ণতা
ব্যাপক ঝুঁকি এপ্রিল-মে মাসে
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো লেক এলাকায়। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩২টির বেশি বজ্রপাত ঘটে। এই রেকর্ডটা করা হয়েছে সারাবছরের গড় বজ্রপাতের হিসাবে। অথচ জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মারাকাইবোতে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। বিশেষ সময় বা মৌসুমভিত্তিক বজ্রপাতের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষে উঠে এসেছে আবার বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জ। মৌসুমভিত্তিক মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় এখানে।
আবহাওয়াবিদসহ গবেষকরা বলছেন, গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বৃহত্তর সিলেট ও হাওরাঞ্চল। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের হটস্পট হয়ে উঠেছে দেশের মধ্যাঞ্চল। গবেষণামতে, দেশে প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ঝড়বৃষ্টি আর বর্ষা মৌসুমে প্রতি বর্গকিলোমিটারে কমপক্ষে ৫০ বার বজ্রপাত হয়। আগামীতে এটা আরো বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মূলত ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ বেশি। মার্চ থেকে মে মাসজুড়ে প্রতিবেশী ভারতের খাসি পাহাড় ও মেঘালয় এলাকায় প্রচুর মেঘ জমে। স্তরীভূত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের ভয়াবহতা বেশি হয়। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে অতিমাত্রায় বজ্রপাতপ্রবণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে বাংলাদেশ। সে হিসাবে, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে এখানেই।
বজ্রপাতের ভয়াবহতা আর আশঙ্কাজনকহারে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত ২০১৬ সালের ১৭ মে জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অবশ্য দেশে বজ্রপাত মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার পেছনে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন অনেক বিজ্ঞানী। তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশে তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৭৪ শতাংশ। যার প্রভাব সামগ্রিক আবহাওয়া ব্যবস্থার ওপরেই পড়েছে। কারণ, উত্তপ্ত বায়ু বজ্রপাত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকদের তথ্যমতে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ভারসাম্য অক্ষুন্ন রাখতে বজ্রপাত প্রাকৃতিক চার্জের কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৃতি বজ্রপাত বাড়িয়ে মাধ্যাকর্ষণের ভারসাম্য ঠিক রাখছে। বছরে এক ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ১২ শতাংশ বজ্রঝড় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে কোনো কোনো বিজ্ঞানী প্রমাণ দেখিয়েছেন।
দীর্ঘকালের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাস অবধি গ্রীষ্মের দিনগুলোয় দেশে বেশি বজ্রপাত ঘটে। তবে গেল কয়েক বছর ধরে জুন-জুলাইয়েও বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাত-প্রবণ এলাকাগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ বজ্রপাত বেশি ঘটছে। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতের হার ১৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ বলে তথ্য দিচ্ছে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইয়ারলি এভারেজ লাইটেনিং ডেনসিটি ম্যাপ।
তথ্যমতে, শহরের তুলানায় গ্রামাঞ্চল ও হাওর এলাকায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে। গবেষণায় দেশের দশটি জেলাকে বজ্রপাতের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ ও চট্টগ্রাম।
গবেষণায় দেশে বজ্রপাতের হার বাড়ার পেছনে চারটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারণগুলো হলো- ১. মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়া, ২.হিমালয়ের পাদদেশে হাওর অঞ্চলগুলোতে উষ্ণতা ও পুঞ্জীভূত মেঘের আধিক্য, ৩. কিউমুলোনিম্বাস মেঘ বা ঝড়োপুঞ্জ মেঘ এবং ৪. পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া।
আনন্দবাজার/শহক









