- মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শঙ্কু
- ‘শঙ্কু দিবস’ পালনে রংপুরে নানা আয়োজন
স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ শঙ্কু সমজদার। যার রক্তে রক্তাক্ত হয়েছিল রংপুরের মাটি। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল মুক্তির সংগ্রাম আর শ্লোগানে। এদিনে অবাঙালির গুলিতে নিহত হন কিশোর শংকু। আগামীকাল ৩ মার্চ শঙ্কু সমজদারের ৫১তম প্রয়াণ দিবস। রংপুরবাসীর কাছে যা ‘শঙ্কু দিবস’ হিসেবে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। দিনটি পালনে রংপুরে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
একাত্তরের ৩ মার্চ পূর্ব ঘোষিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ায় কথা থাকলেও হঠাৎ করেই কোন কারণ ছাড়া পাকিস্তানী শাসক প্রধান ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। এই হঠকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় ৭০’র নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া আওয়ামী লীগসহ সারা বাংলার মানুষ। ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। রংপুরেও হরতাল পালিত হয়। সেই অসহযোগ আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ১২ বছর বয়সী শঙ্কু সমজদার।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পাকিস্তানি দখলদারদের শোষণ-শাসন এবং ষড়যন্ত্রের খপ্পর থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে বঙ্গবন্ধুর আহবানে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল রংপুরের মানুষ। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ যুবক, ছাত্র, কৃষক, দিনমজুর, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের জনতা রংপুর শহরের কাচারিবাজারে সমবেত হয়েছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও তৎকালীন রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম গোলাপ, অলক সরকার, মুকুল মুস্তাফিজ, নূর উর রসুল চৌধুরী, হারেস উদ্দিন সরকার, ইলিয়াস আহমেদ, মুসলিম উদ্দিন (মুসলিম কমিশনার), আবুল মনসুর আহমেদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে মিছিল বের হয়। সকাল ৯টায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শঙ্কু সমজদারও শহরের গুপ্তপাড়ার বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য। মিছিলটি শহরের তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্ত্বর) এলাকায় আসতেই কলেজ রোড থেকে কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শহীদ মুখতার ইলাহি, জিয়াউল হক সেবুসহ অন্যান্যদের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল এসে যোগ হয় মূল মিছিলের সাথে। মিছিলটি আলমনগর এলাকায় অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাসার সামনে যেতেই কিশোর শঙ্কু ওই বাসার দেওয়ালে উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড দেখে তা নামিয়ে ফেলতে ছুটে যান। আর তখনই বাসার ছাদ থেকে মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হন মিছিলে আসা স্কুলছাত্র শঙ্কু সমজদার। গুলির বিকট শব্দে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মাটিয়ে লুটিয়ে পড়া গুলিবিদ্ধ কিশোর শঙ্কুকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে ইতিহাস রচিত হয়ে গেছে। পথেই কিশোর শঙ্কু মারা যান।
এদিকে শঙ্কুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ক্ষোভের আগুনে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পুরো রংপুর। গুলিবিদ্ধ কিশোর শঙ্কুর রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে জনতা উত্তেজিত হয়ে সারা শহরে অবাঙালিদের দোকান-পাট ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। যে বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল সেই বাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হলেও ইপিআর বাহিনী এসে বাঁধা দান করে। পরে বিকেল ৩টায় রংপুর শহরে কারফিউ জারি করা হয়।
সেদিনের মিছিলে অংশ নেওয়া প্রত্যক্ষদর্শী কবি ও সাংবাদিক নজরুল মৃধা বলেন, ‘আমিও ওই মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম। আমাদের কিশোরদের কাজ ছিল রাস্তার পাশে বিভিন্ন বাসা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে উর্দু ও ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা। অবাঙালি সরফরাজ খানের বাসায় উর্দু লেখা সাইনবোর্ড ছিল। সেটি ভাঙার সময়েই সরফরাজ খানের বাসা থেকে গুলি করা হলে শঙ্কুর মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। এসময় মুসলিম উদ্দিন (মুসলিম কমিশনার) লুটিয়েপড়া শঙ্কুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন।’
রংপুর মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু বলেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সারাদেশের ভূমিকার পাশাপাশি সংগ্রামী ও অবহেলিত জনপদ রংপুরের অবদান ছিল অগ্রগণ্য। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সূচনা হয় রংপুর, ঢাকা ও সিলেট থেকেই। স্বাধীন বাংলার প্রথম মিছিল হয়েছিল এ রংপুরেই। আর রংপুর স্বাধীনতার প্রথম শহীদের দাবিদারও।
তিনি জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে রংপুরের শঙ্কু সমজদার। বর্তমান সরকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় শঙ্কু সমজদারের নাম অন্তর্ভূক্ত করেছে। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে সরকারি নির্দেশে ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় রংপুর জেলা প্রশাসন শঙ্কুর স্মৃতি রক্ষায় নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় ১০ শতক জমির দলিলপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হন্তান্তর করেছে। ওই বাড়িতে থাকা শহীদ শঙ্কুর মা দীপালী সমজদার বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির দেওয়ালসহ দৃষ্টিনন্দন গেটে শঙ্কুর স্মৃতিফলক করে দেওয়া হয়েছে।









