- ক্ষতি ১২ কোটি টাকা
- ঋণ পরিশোধে দুশ্চিন্তা
- মৎস্য বিভাগ খোঁজ নিচ্ছে না, অভিযোগ চাষিদের
ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেত্রকোণার ৭৭টি ইউনিয়ন। পানিতে ভেসে গেছে সাড়ে ২৬ হাজার পুকুরের প্রায় ১২ কোটি টাকার মাছ। এতে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে গেছে অনেকের, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার প্রায় সব মৎস্যচাষিই। তবুও খোঁজ নিচ্ছে না মৎস্য বিভাগ, দিচ্ছে না প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা এমন অভিযোগ মৎস্য খামারিদের। তবে প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখা হচ্ছে ও চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
বন্যার পানিতে নেত্রকোণা জেলা আক্রান্ত হওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে। এ সময়ের মধ্যে প্লাবিত হয়েছে জেলার ১০ উপজেলার ৭৭টি ইউনিয়ন। তলিয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত। ভেসে গিয়েছে জেলার অধিকাংশ পুকুরের মাছ। যার ফলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্যচাষিরা।
জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, ১০ উপজেলার ১৫ হাজার ৮২৬জন পুকুর মালিকের ছোট বড় মিলিয়ে ২৬হাজার ৪১৭টি পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। যার আয়তন ৩ হাজার ৫৩৮ হেক্টর। ভেসে গিয়েছে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন মাছ। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। এতে মৎস্যচাষিদের চোখে ছিলো অদম্য স্বপ্ন। আজ তাদের কাছে সবই দু:স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মাছ হারিয়ে হারিয়েছেন পুঁজি, কারও কারও ঋণ নিয়ে গড়ে তোলা ফিসারির ঋণ ফেরতের চাপ সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন তারা। রাতারাতি বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় মাছ রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন মৎস্য খামারিরা।
এদিকে তাদের অভিযোগ, যখন দিন কাটছে চরম দুর্দশা ও হতাশায় তখন পাশে নেই মৎস্য বিভাগ। কোনো ধরনের যোগাযোগ করছেন না বিভাগের কর্মকর্তারা, দিচ্ছেন না কোনো নির্দেশনা তাই চাষিরা পাচ্ছেন না ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার মত কোনো আশ্বাস।
নেত্রকোণা বারহাট্টা উপজেলার সাহতা ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে নিপা এগ্রো ফিশারিজের স্বত্বাধিকারী রোকনুজ্জামান খান খোকনের জানান, তিনি ৭০ কাটা পুকুরে পাবদা, তেলাপিয়া, শিং, রুই, কাতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করেছিলেন। মাছ প্রায় বিক্রির উপযোগি হয়ে উঠেছিল। বিক্রি শুরু হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। আশা করছিলেন প্রায় ৩০ লাখ টাকার মাছ ও পোনা বিক্রি করতে পারবেন। তবে, বিধিবামের আগেই আকস্মিক বন্যায় সব মাছ ভেসে গেছে। পুকুরের চারপাশে কলা ও সবজি চাষ করেছিলেন। সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংক থেকে তিনি ঋণ নিয়েছিলেন ১২ লাখ টাকা। ভেবেছিলেন মাছ উঠিয়ে বাজারে বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন। তবে সে আশায় গুড়ে বালি। এখন ভেবে পাচ্ছেন না কিভাবে এ ঋণ শোধ করবেন।
আরও দু’জন মৎস্য খামারি আরিফুর রহমান ও মোখলেছুর রহমান। তারা দু’জন মিলে বাউসি, আসমা ও সাহতা ইউনিয়নে মোট ৩৪ একর পুকুরে পাবদা, গুলশা, তেলাপিয়া, সিং, রুই, কাতল, কার্ফু ও সিলভার মাছের চাষ করেছিলেন। তারা জানান, কিছু কিছু মাছ তারা বিক্রি শুরু করেছিলেন। দুই কোটি টাকার উপরে মাছ বন্যার কারণে খামার থেকে বেরিয়ে গেছে। তারা প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ইসলামী ব্যাংক ও আল আরাফা ব্যাংক থেকে মাছ চাষের জন্য তারা ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এ ঋণ তারা কবে কিভাবে শোধ করতে পারবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না।
বাউসি ইউনিয়নের অন্য এক মৎস্যচাষি ইলিয়াছ তালুকদার জানান, আমরা এখন ঋণের আতঙ্কে আছি। সব শেষ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম ঘুরে দাঁড়াবো। সে আশা তো এখন বাদ। কিভাবে কি যে হবে! কৃষি ব্যাংক থেকে ১১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছিলাম। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অন্য জায়গা থেকেও ঋণ নিয়েছি। মোট ৩০ লাখ টাকা ফিসারিতে ইনভেস্ট করেছিলাম। বন্যার কারণে আমাদের চাষের মাছ সব পুকুর থেকে চলে গেছে। পাঁচটি পুকুরে তেলাপিয়া, পাবদা ও গুলশান মাছ চাষ করেছিলাম। ভাবছিলাম বিক্রি করে ঋণ শোধ করে লাভবান হব। এখন দেখছি ঋণ শোধ করতে করতেই জীবন পার করতে হবে। ঋণশোধের আতঙ্কে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। ব্যাংক যদি বর্তমান পরিস্থিতি আমলে নিয়ে আমাদেরকে একটু দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ দেয় তাহলে খুব ভালো হবে।
এমতাবস্থায় সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা জেলার মৎস্য খামারিদের।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর বলেন, মৎস্য চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা তৈরীর করে তা ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণের কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, তালিকা প্রণয়ন সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।









