- মাইলেজ সুবিধা পরিবর্তন
বাংলাদেশ রেলওয়ের রানিং স্টাফদের (লোকোমাস্টার, গার্ড এবং টিটিই) মাইলেজ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা সুরাহা না হওয়ায় গত ২৫ জানুয়ারি থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি ডিউটি করছেন না ট্রেন চালকরা। ব্রিটিশ আমল থেকেই রেলের রানিং স্টাফরা এ মাইলেজ সুবিধা পান। ১৬২ বছর আগে থেকে এ বিধান চলে আসছে। কিন্তু সরকারের নতুন নিয়মে রেলওয়ে রানিং স্টাফদের এসব সুবিধা থাকছে না। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। বিষয়টি আজকের মধ্যে সমাধান না হলে সারাদেশে ট্রেন চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করছে সংশ্লিষ্টরা। সোমবার থেকে ট্রেন চলাচলে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণায় অটল রয়েছে ট্রেন চালকরা। রানিং ষ্টাফদের এ আন্দোলনের ফলে একেরপর এক ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটে চলেছে।
সর্বশেষ, রেলের রানিং স্টাফদের আন্দোলনের জেরে বাতিল হয়েছে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডের (সিজিপিওয়াই) একটি গুডস ট্রেনের যাত্রা। শুক্রবার লোকোমাস্টার ও সহকারি লোকোমাস্টার সংকটের মুখে সিজিপিওয়াই ৬০৩ আপ ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই থেকে ট্রেনটি ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে (ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো) যাওয়ার কথা ছিল।
সুত্রে প্রকাশ, ট্রেনে আট ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব পালনের জন্য লোকোমাস্টার, গার্ড ও টিটিইরা আগে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পেতেন, যা রেলওয়ের ভাষায় মাইলেজ। সম্প্রতি রাষ্ট্রের বেসামরিক কর্মীদের মূল বেতনের অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার বিধান নেই উল্লেখ করে অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে রেলের রানিং স্টাফদের মাইলেজ সুবিধা বাতিল করা হয়। এখন এ মাইলেজ সুবিধা চালুর জন্যই আন্দোলন করছেন স্টাফরা। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চালকরা ৮ ঘণ্টার বেশি ডিউটি করছেন না। এতে চালক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমনিতে সারাদেশে ট্রেনের চালক সংকট দীর্ঘদিনের। এখন আন্দোলনের কারণে একেরপর পর এক বাতিল হচ্ছে ট্রেনের সিডিউল। আন্দোলনের কারণে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী ৩ জোড়া শাটল ট্রেন, চট্টগ্রামনাজিরহাটগামী একজোড়া ডেমু ট্রেন ও চট্টগ্রাম দোহাজারীগামী একটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। মাইলেজ ভাতা আগের নিয়মে বহাল রাখার দাবিতে গত কয়েক মাস ধরে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসছে রেলের রানিং স্টাফরা। ইতোমধ্যে স্টাফরা তাদের মাইলেজ জটিলতার বিষয়টি সুরাহার জন্য রেলমন্ত্রী, রেলওয়ের মহাপরিচালক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। রানিং স্টাফদের সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সমাধানের কার্যকর কোনো ঘোষণা আসেনি। এদিকে রানিং স্টাফদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির বিষয়টি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম, প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী, ডিআরএম, পরিবহন কর্মকর্তা ও বাণিজ্যিক কর্মকর্তাসহ র্ঊর্ধ্বতন সকল কর্মকর্তাদেরকেও জানিয়ে দিয়েছেন বলে জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিককর্মচারী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান ভূইয়া। তিনি বলেন, মাইলেজ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দূর না করলে সোমবার থেকে ট্রেন চলাচলে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে আমরা অটল আছি। অর্থমন্ত্রণায়ের প্রজ্ঞাপন বাতিল না হলে সারাদেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। যেভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে, তা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
মুজিবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রেলওয়ে স্টাবলিশমেন্ট কোড ভলিউম ১ এর চ্যাপ্টার ৫ এবং লোকোমোটিভ অ্যান্ড রানিং শেড ম্যানুয়াল জিআই চ্যাপ্টার ১২ অনুযায়ী ১০০ মাইল কিংবা ৮ ঘণ্টার বেশি ট্রেন চালালে একজন রানিং স্টাফ মাইলেজ (রানিং ভাতা) প্রাপ্য হবেন। অতিরিক্ত ট্রেন চালালে প্রতি ঘণ্টা ও মাইল অনুযায়ী একদিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ মাইলেজ হিসাবে তিনি পাবেন। প্রতিমাসে যেখানে রানিং স্টাফরা ১১ হাজার মাইলের মাইলেজ ভাতা পেতেন, সেখানে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ‘আইবাস প্লাস প্লাস সিস্টেমে’ তাদের মাইলেজ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিন হাজার মাইলের বেশি দেওয়া যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিন হাজার মাইলের বেশি ট্রেন চালালেও তারা বেশি মাইলের জন্য কোনো ভাতা পাবেন না।
জানা যায়, রেলওয়ে আইনের ১৬৮৫/১০৮৫ বিধিতে বলা হয়েছে ট্রেন চালক, গার্ড ও ট্রেন টিকিট পরীক্ষকরা (টিটিই) হলেন রানিং স্টাফ। তারা নির্ধারিত ডিউটির পাশাপাশি কর্মরত অবস্থায় যত দূরত্ব পর্যন্ত ট্রেন চালাবেন সে হিসাবে মাইল গুণে বাড়তি ভাতা পাবেন। রেলওয়ে আইনে সাপ্তাহিক বা সরকারি বন্ধের দিনে ডিউটি করলে হলিডে মাইলেজ প্রাপ্তির বিধানও রয়েছে। তবে সম্প্রতি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে বেতনভাতা প্রদান প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিতে বিশেষ ভাতা সীমিত করা হয়েছে। যা কোনো অবস্থাতেই মেনে নিচ্ছেন না রানিং স্টাফরা। ১৬২ বছর আগে থেকে এ বিধান চলে আসছে। কিন্তু নতুন নিয়মে রেলওয়ে রানিং স্টাফদের এসব সুবিধা থাকছে না। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। বিষয়টি আজকের মধ্যে সমাধান না হলে সারাদেশে ট্রেন চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
আনন্দবাজার/এম.আর









