- উত্তরে কমছে চাষ
- স্বাস্থ্যসুরক্ষা পাবে বিশাল জনগোষ্ঠীর
- ঘানিতে তেল উৎপাদনে ফিরবে সুদিন
সূর্যমুখী। সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে বলে তার এ নাম। তবে উত্তরের চাষিরা অনেক চেষ্টা করেও সূর্যমুখীর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছেন না। উৎপাদন খরচ কম হলেও স্থানীয়ভাবে সূর্যমুখীর তেল তৈরির ঘানি না থাকা এবং বাজারে এর অন্যান্য ফসলের মত চাহিদা না থাকায় লোকসান গুনতে হয় চাষিদের। এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সূর্যমুখীর চাষ না হলেও শখ করে চাষিরা রবি মৌসুমে এর চাষ করতেন। চরাঞ্চলেও এর ফলন হচ্ছে আশাতীত। তবে কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় ক্রমান্বয়ে সম্ভাবনাময় তেলজাতীয় এ ফসলের চাষ কমে যাচ্ছে। একসময় আবাদকৃত সরিষা দিয়ে নিজস্ব ঘানিতে তেল উৎপাদন করতেন চাষিরা। তখন একমাত্র ভোজ্যতেল হিসেবে খাঁটি এই সরিষার তেলের কোন বিকল্প ছিলনা। পরবর্তীতে এর স্থান দখল করে নেয় আমদানিনির্ভর সয়াবিন তেল। তবে তর তর করে এই তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে যাওয়ায় ভোজ্যতেলের বিকল্প উৎস হিসেবে সূর্যমুখী চাষের চিন্তা করেন চাষিরা। সূর্যমুখীর পরিপক্ক বীজ থেকে তেল হয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে ওই বীজ থেকে তেল উৎপাদনের সুযোগ না থাকাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার করণে চাষিরা সূর্যমুখী থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গত বছর রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এক হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে চাষ হলেও চলতি বছর মাত্র ৩৬০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে।
দেখতেই শুধু রূপময় নয়, গুণেও অনন্য। সূর্যমুখীর বীজের তেল স্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ। অন্যান্য তেলবীজে যেসব ক্ষতিকারক উপাদান (বিশেষ করে কোলেস্টেরল) থাকে সূর্যমুখীতে তা নেই। বরং এতে আরও উপকারী উপাদান ও পুষ্টিগুণ বিদ্যমান। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারের প্রসিদ্ধ কিছু দোকানে বোতলজাত সূর্যমুখীর তেল দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানির নিজস্ব উৎপাদিত ও বিদেশ থেকে আমদানি করা। দাম অনেক, তাই সাধারণের খাদ্যতালিকায় সূর্যমুখী তেলের প্রচলন নেই। যদিও পাশ^বর্তী দেশ ভারতে এই তেল খুবই জনপ্রিয়। অন্য তেলের চেয়ে একটু দাম বেশি হলেও তা সহনশীল ভারতের বাজারে। তাই ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে অঞ্চলভেদে সূর্যমুখী তেলের ব্যবহার লক্ষণীয়। সবক’টি তেলবীজের তালিকায় সূর্যমুখীও ভারতীয় উৎপাদিত তেলবীজের অন্তর্ভুক্ত, যা আমাদের দেশে সূর্যমুখী তেল সাধারণের সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে এখনো অসফল। অথচ বাংলাদেশের আবহাওয়া, জল, মাটি সূর্যমুখী চাষের অনুকূলে-সম্ভাবনাও আছে প্রচুর। অনেক অঞ্চলে এর চাষ হচ্ছে, তবে প্রসার লাভ করছে না সে রকমভাবে। বিদেশ থেকে যে রিফাইন্ড সয়াবিন তেল আমদানি করা হয় তাতে আছে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান। সেক্ষেত্রে দেশীয়ভাবে সূর্যমুখীর বীজকে প্রধান্য দিয়ে রিফাইন্ড না করেও শুধু ঘানিতে যদি সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা যেত, তাহলে এই ভোজ্যতেলও হতে পারে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুস্বাস্থ্যকর।
সরেজমিনে তিস্তার বালুচরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে হলুদের সমারোহ। সূর্যের দিকে মুখ করে যেন হাসছে সূর্যমুখী। হৃদরোগের জন্য উপকারী এই সূর্যমুখী ফুল চাষ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় অনেকে আবার শখ করে চাষ করেছেন দৃষ্টিনন্দন সূর্যমুখীর চাষ। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় লক্ষ্মিটারী ইউনিয়নের তিস্তার জেগে ওঠা চরে শখের বশে সূর্যমুখীর চাষ করেছেন শাহীনুর রহমান। তিনি জানান, বীজ বপন থেকে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত ৯০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে সূর্যমুখীর বীজ সংগ্রহ করা যায়। শুধু শোভাবর্ধন ও ফুল হিসেবে বিক্রির জন্য ২০ শতক জমিতে এর চাষ করেছেন তিনি। ১০০ কেজি বীজ থেকে ৪৪ লিটার তেল পাওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়ভাবে এর থেকে তেল তৈরি করার সুযোগ নেই। পরিপক্ক সূর্যমুখী বীজের চাহিদা রয়েছে পরবর্তী মৌসুমে বীজ হিসেবে বপনের জন্য। প্রতি শতকে সূর্যমুখীর ১২ কেজি বীজ উৎপাদন হয়। প্রতি মণ বীজের দাম দুই হাজার ৪০০ টাকা বলেও জানান তিনি। আরেক চাষি একই উপজেলার মালিপের বাজার এলাকার রুবেল চৌধুরী বলেন, সূর্যমুখীর চাষ খুব সহজ-খরচও কম। এই ফসলে তেমন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হয় না। গঙ্গাচড়ায় ২৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও তিস্তার চরসহ এবছর মোট ১৬ হেক্টর জমিতে এর চাষ হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সূর্যমুখীর চাষ বৃদ্ধির জন্য চাষিদের সবসময় উৎসাহিত করা হচ্ছে। যাঁরা সূর্যমুখীর চাষ করেছেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁদের সব ধরণের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, সূর্যমুখী তেলে ‘লিনোলিক’ নামক এসিড রয়েছে। এটি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অনেক উপকারী। সূর্যমুখীর তেল উৎপাদনসহ এর ব্যবহারে সাধারণ মানুষ করে খেতে অভ্যস্ত হলে সূর্যমুখীর চাষ যেমন বাড়বে, চাষিরাও লাভবান হবেন।
সূর্যমুখী চাষি ও সচেতন মানুষজন জানান, ক্রয়ক্ষমতাসহ শারীরিক সুস্থতার বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। সরকারিভাবে রিফাইন্ড মেশিনারি সরঞ্জাম আমদানির মাধ্যমে সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল সংগ্রহ ও রিফাইন্ড সূর্যমুখী তেল বোতলজাত ও বাজারজাত করা গেলে এর উৎপাদনে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ হতে পারে। প্রয়োজনে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে হলেও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে, তেল সহজলভ্য হবে। তাহলে ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা সয়াবিন তেলের ওপর নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে।
কৃষি বিভাগ জানায়, রংপুর অঞ্চলে এবছর মাত্র ৩৬০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরে ১৪০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১৪০ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৭৫ হেক্টর, লালমনিরহাটে এক হেক্টর এবং নীলফামারীতে চার হেক্টর। যদিও গত বছর এসব জেলায় এক হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপ পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল জানান, সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখী ও সরিষা চাষ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এবছর চাষিদের মাঝে হাইব্রিড জাতের বীজ সরবরাহ কর হয়, ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সয়াবিন ও সরিষার তুলনায় সূর্যমুখীর তেল স্বাস্থ্যের জন্য বেশী উপকারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলে ব্যাপক সূর্যমুখীর চাষ হলে একসময় আধুনিক যন্ত্রপাতিও আসবে, চাষিরা তখন সরিষার মত স্থানীয় ঘানিতে সূর্যমুখীর তেল বের করতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে তেমনি সয়াবিন তেলের আমদানি নির্ভরতা কমবে। আর লাভবান হবেন চাষিরা।’









