নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে মা ইলিশ শিকার। গত ১২অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পযন্ত মা ইলিশ শিকার, ক্রয়-বিক্রয়, বিপণন সম্পূর্ণ নিষেধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ । কিন্তু টাকার বিনিময়ে চলছে মা ইলিশ ধরার অনুমতি। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজার জেলে পরিবার এর মধ্যে ৭৫০ জন জেলে পেয়েছে সরকারি প্রনোদনা। এতে করে দিন এনে দিন খাওয়া জেলেরা পড়েছে বিপাকে। স্থানীয়রা বলছে একটি দালাল চক্রের যোগসাজোস্যের রাতের বেলায় টাকার বিনিময়ে মিলছে মা ইলিশ ধরার অনুমতি।ইলিশ মাছ নিতে পুলিশ বাধা দিলে পুলিশকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
পাবনার পদ্মা নদীতে দিনে-রাতে অবাধে চলছে মা ইলিশ শিকার। মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পদ্মা নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী চলছে মা ইলিশ শিকার। রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের একের পর এক অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না ইলিশ শিকার। এখন নদীপাড়ের বাতাসে ভাসছে ইলিশের গন্ধ। এই মাছ বেচা-কেনা চলছে নদীপাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে। এসব পয়েন্টে অনেক রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে ইলিশ বেচাকেনা।
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাবনার বেড়া উপজেলার ঢালারচরের বারোকোদালিয়া থেকে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত পদ্মার ৬০ কিলোমিটার এলাকায় অবাধে চলছে মা ইলিশ শিকার। ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে জেলেরা মা ইলিশ শিকার করছে। তাদের জালে ডিমওয়ালা রুপালি ইলিশের সাথে ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা ধরা পড়ছে। প্রতিটি জালে মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে ধরা পড়ছে প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি মা ইলিশ। এসব ইলিশ আকারভেদে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বড় আকারের ইলিশ প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একটু কম দামে ইলিশ কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন স্থানীয় ক্রেতারা।
সরেজমিন দেখা যায়, বেড়া, কাজীরহাট, সুজানগর, পাবনা সদর ওউপজেলার পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে রাতে ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে। এ মাছের বেশির ভাগ ক্রেতা পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে আসছেন। তারা কম দামে ডিমওয়ালা মা ইলিশ মাছ কিনে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এলাকার অনেকেই ইলিশ কিনে শুধু নিজের ফ্রিজই ভরছেন না, সেই সাথে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠাচ্ছেন।
প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতে নদীতে ইলিশ ধরছেন জেলেরা। স্থানীয় প্রশাসন দিনে মাঝে মধ্যে ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছে। তাতে থামছে না মা ইলিশ শিকার। কারণ অভিযানের খবর আগে ভাগেই জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া প্রশাসন রাতে অভিযান পরিচালনা না করায় জেলেরা রাতে ইলিশ শিকার করছে। এ জন্য ঘাটে ঘাটে নৌকাপ্রতি নির্ধারিত হারে উৎকোচ দিতে হয়। জেলেরা বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে তালিকাভুক্ত জেলেরা সরকারি খাদ্যসহায়তা পেয়েছে, তালিকার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক জেলে এই সহায়তা পাননি। তাই বাধ্য হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা নদীতে মাছ ধরছেন। এখন পযন্ত ১৫ দিনে ৩৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয় যার বাজার মূল্য ৪ লক্ষ টাকা।
বেড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তিন থেকে চারজন করে জেলে মাছ ধরায় ব্যস্ত আছে। কেউ জাল ফেলছে, কেউ তুলছে আবার কেউবা নৌকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ ছাড়া ঢালারচরের ১৫ কিলোমিটার উজানে সুজানগরের নাজিরগঞ্জে দিনের বেলা জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছ শিকার করছে। কিছু সময় পর সেখানে প্রায় ২০ কেজি মাছ শিকার করে ফিরে আসা জেলে বলরাম হলদার বলেন, পেটে দিলে পিঠে সয়। নিষেধাজ্ঞা দেবেন অথচ খাবার দেবেন না, তাহলে আমরা না খেয়ে মরব। অপর জেলে নিতাই হলদার বলেন, ‘শুনছিলাম মৎস্য অফিস এই নিষেধাজ্ঞার সময় তালিকাভুক্ত জেলেদের চাল দিয়েছে। তালিকায় যাদের নাম নেই তাদেরকে চাল দেয়া তো দূরের কথা, একবারের জন্য জিজ্ঞাসা করে নাই আমরা কেমন আছি। বরং যারা তাদের ফাঁকি দিয়ে নদীতে নামতাছে তাগরে ধইরা নিয়ে জেলে ঢুকাইয়া দিতাছে।
জেলে মকবুল বলেন, নদীর পাড়ে বসবাস করা বেশির ভাগ জেলেই দিন আনে দিন খাওয়া পরিবারের সদস্য। একদিন নদীতে মাছ না ধরলে তাদের পরিবারের সদস্যদের অনাহার আর অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। তাই প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারির সাথে সাথে যদি চাল বিতরণ করত তাহলে জেলেরা নদীতে নামতে আর সাহস পেত না।
এদিকে মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিদিনই জেলা-উপজেলা মৎস্য বিভাগ, জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় পদ্মা নদীতে অভিযান পরিচালনা করে আটক করা হচ্ছে জেলেদের। জব্দ করা হচ্ছে কারেন্ট জাল ও মাছ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আটক জেলেদের করা হচ্ছে জরিমানা এবং দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড। পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে জাল।
একাধিক জেলে বলেন, যে সময় নদীতে মাছ বেশি পাওয়া যায় সে সময় মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এ সময় মাছ ধরতে নদীতে নামলেই জাল নৌকাসহ তাদের ধরে নিয়ে জেল জরিমানা করা হয়। কিন্তু মাছ ধরেই তাদের সংসার চলে। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাদের সংসার চলবে কিভাবে? এ জন্য বাধ্য হয়েই জেল-জরিমানার ভয় না করে মাছ ধরতে নদীতে নামছেন তারা। তারা সাহায্য-সহযোগিতা পেলে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখতেন।
পাবনা জেলা মৎস্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জেলা-উপজেলা মৎস্য বিভাগ পদ্মা নদীকে মাছ ধরার নৌকামুক্ত রাখতে দিন-রাত পরিশ্রম করছে। সহযোগিতা করছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। আজ পর্যন্ত অভিযানে তিন শতাধিক জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। সেই সাথে লাখ লাখ মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করে তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।









