স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি ছাড়া কোনো পথ নেই। দেশের মানুষের সুস্থ থাকার সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিও জড়িত। দেশের মানুষের পকেট থেকে প্রচুর অর্থ চলে যাচ্ছে ওষুধপত্র কিনতে। এটি ৬৭ শতাংশের কাছাকাছি। অথচ সরকার ইচ্ছা করলেই এখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে নাগরিকদের সবা নিশ্চিত করতে পারে।
তা ছাড়া বর্তমান সরকার ২০১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে শূন্য হতে এক বছর ও ৬৫ বছরে ঊর্ধ্ব বয়সীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যয় সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ এবং উন্নয়ন সমন্বয়ের যৌথ উদ্যোগে ‘স্বাস্থ্য বাজেট বিষয়ক অনলাইন জাতীয় সংলাপ’ তারা এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০ থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জুম প্ল্যাটফর্মে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ বাজেট থিমেটিক গ্রুপের সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হকের সঞ্চালনায় ‘সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য বরাদ্দের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্যবৃন্দ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, স্বাস্থ্যখাতে মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি বরাদ্দে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্ব নিম্নে অবস্থান করছে। এখানে শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ। সেখানে ১৫৭ মার্কিন ডলার, ভূটানে ১০৩, ভারতে ৭৩ ও নেপালে ৫৮ মার্কিন ডলার। অথচ বাংলাদেশে ৪৫ মার্কিন ডলার যা জিডিটির মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ এসব কারেন্ট হেলথ এক্সপেন্ডিচার-সিএইচই এর প্রতিবেদনের। তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ৫-৬শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অথচ দেশের ৪৩ শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়ে থাকে।
ড. আতিউর রহমান বলেন, প্রতি বছর গড়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাড়লেও জাতীয় বাজেটে শতাংশ হিসেবে তা বাড়ছে না। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা ও শতাংশ হিসেবে ৫.২, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা ও শতাংশ হিসেবে ৪.৮, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৫৩২ ও শতাংশ হিসেবে ৪.২, ২০২০-২১ এর সংশোধিত বাজেটে ৩১ হাজার ৪৭২ ও শতাংশ হিসেবে ৫.৮ ও ২০২১-২২ প্রস্তাবিত বাজেটে ৩২৭৩১ কোটি টাকা ও শতাংশ হিসেবে ৫.৪। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে নাগরিকরা নিজের পকেট থেকে ৬৮ শতাংশ ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। সরকারি ব্যয় ২৩, উন্নয়ন সহযোগিদের ৫, ব্যক্তি ও নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন-এনজিওখাতের ২ শতাংশ করে ৪ শতাংশসহ মোট ৩২ শতাংশ ব্যয় হয়। এই ব্যয়ের মধ্যে ওষুধ ও অন্যান্য পচনশীল চিকিৎসা সামগ্রিতে ৬৭ শতাংশ, আউটপেশেন্ট কিউরেটিভ সেবা ১৩ শতাংশ, ইনপেশেন্ট কিউরেটিভ সেবা ৮, ল্যাবরেটরিতে ৭ ও ইমেজিং সেবাতে ৫ শতাংশ ব্যয় হয়।
ড. আতিউর রহমান বলেন, আগামী বাজেট ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার হতে পারে। যা জিডিপির ১৫. ৪ শতাংশ। চলতি বছর এটি আছে ১৭.৫। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি হতে পারে ৫.৬ শতাংশ। চলতি বছর এটি আছে ৬.৫ শতাংশ। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি মানুষ সেবা নিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যায়। অথচ এখানে বাজেট সবচেয়ে কম। প্রাইমারিতে ২৫, সেকেন্ডারিতে ৩৯ ও টারসিয়ারিতে ৩৬ শতাংশ ব্যয় হয়। এটি বৃদ্ধি করতে হবে।
এ সময় আসন্ন জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের ৭-৮ শতাংশ ও মধ্যমেয়াদে ১০-১২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তিনি। প্রাথমিকে ৩০ শতাংশ ও মধ্যমেয়াদে ৩৫-৪০ শতাংশ করতে হবে। স্বাস্থ্য বাজেটের ২৫ শতাংশ চিকিৎসা ও শৈল্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদিতে বরাদ্দ ও মধ্যমেয়াদে তা ৩৫-৪০ শতাংশ করতে হবে। এডিপিতে স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দ বাস্তবায়নের হার ৮০-৮৫ শতাংশ ও মধ্যমেয়াদে ৯০-৯৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে বলে জানান ড. আতিউর।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক এমপি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে আমাদের শিক্ষক সংকট। সরকার করোনায় উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে স্বাস্থ্যখাতে। এতে বিশ্ববাসীর কাছে প্রশংসা পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্যখাত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুল হক বলেন, স্বাস্থ্যখাতের বেশি সমালোচনার জায়গা নেই। তবে বাজেট আরো কিছু বাড়াতে পারলে ভালো হয়। তিনি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ডাক্তারদের ২ বছরের ইন্টার্নশিপ করার যে ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নিয়েছিলেন এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান ডাক্তারদের হালচাল উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, দুই পৃষ্ঠার একটি প্রেসকিপশন আমার কাছে এসেছে। এটিতে একই ওষুধ দুইবার তিনবার লেখা আছে। তাতে দেখা যায় ওষুধের ভারে রোগীকে মেরে ফেলার উপক্রম। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডাক্তারদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের পদোন্নতি দিতে হবে। মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপর ৫১ শতাংশ ট্যাক্স রয়েছে এসব কমাতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত- এমপি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ইউনিট, থানা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও অন্যান্য মেডিকেল কলেজের বাজেট নির্ধারণ করে দিতে হবে। তা ছাড়া দেশে এতগুলো ফার্মাসিউটিকেল কোম্পানি প্রয়োজন আছে কিনা তা ভাবা দরকার। কারণ কারখানা থেকে ওষুধ বের হওয়ার সময় পরীক্ষা করার মতো জনবল ওষুধ অধিদপ্তরের নেই। বর্তমান ৪৫ ডলারের সঙ্গে আরো ১০ ডলার বাড়িয়ে ৫৫ ডলার করতে হবে। তা না হলে স্বাস্থ্যখানে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ডা. মো. হাবিব মিল্লাত এমপি বলেন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য বাজেট সামান্য কিছু বাড়ানো হয়েছে। এটি না করে বরং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। দরিদ্রমানুষ কি যথাযথ সেবা পাচ্ছে? বছরে ১০০ ডাক্তার তৈরি হলেও মেডিকেলে শিক্ষকের অভাব। মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দিতে ৮ লাখের বেশি ডাক্তার, নার্সসহ চিকিৎসাকর্মী দরকার। অথচ সরকারিভাবে ২৯ হাজার ৪৪৮ জন, সিনিয়র স্টাফ ও সহকারী নার্স মিলে ৪০ হাজার ৮০৮ জন। আর মেডিকেল সংগঠনের হিসেবে দেশে এক লাখ ডাক্তার রয়েছে। তাদের বিশাল একটি অংশ অন্য পেশায় চলে গেছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মোশতাক হোসেন বলেন, শহরে কমিউনিটি ক্লিনিক করতে হবে। ২০১১ সালে স্বাস্থ্যনীতি হওয়ার পর এটি কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়নি। একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে শূন্য হতে এক বছর ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নির্বাচিত হয়ে সাড়ে তিন বছর অতিক্রম করলেও এখাতে কোন বরাদ্দ দেয়নি। দ্রুত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটসের পক্ষ থেকে ৭টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো-
১. পাঠক্রমে স্বাস্থ্যশিক্ষা অন্তর্ভুক্তকরণ: তৃতীয় হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত (১০ বছর) মানবজীবনের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানের ৪০ শতাংশ এসব পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তকরণ ও বাধ্যতামূলক করা।
২. স্বাস্থ্যসেবা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা: স্বাস্থ্যসেবা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা, দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি বছরে আয়ের এক হাজারের ২ টাকা সেখানে চাঁদা দেবে।
৩. বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ : ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ এমনকি সম্ভব হলে প্রতিটি প্রাণীর স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে করতে হবে। এজন্যে কমিউনিটিবেজড স্বাস্থ্যসেবা ও প্রত্যেককে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
৪. স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি: স্বাস্থ্যসেবায় রোবোটিক্স ও অন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
৫. স্বাস্থ্যবিষয়ক টিম গঠন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিষয়ক টিম গঠন ও প্রান্তিক মানুষের কাছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার আবেদন পৌঁছে দেয়ার সহজ উপায় বের করা।
৬. গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি: স্বাস্থ্যসেবাখাতের গবেষণায় অধিক হারে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা।
৭. উপকূলের একটি অন্যতম সমস্যা লবণাক্ততা। এ জন্য সমগ্র উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নদীরতীরবর্তী এলাকায় দশবেড বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ ও স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্ধ রাখা। বিশেষ করে সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার জন্য ভাসমান হাসপাতাল বা স্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণে বরাদ্দ রাখা।
আনন্দবাজার/শহক









