প্রচলিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ
দূষণের ভয়াবহতা
- শব্দদূষণে নষ্ট হচ্ছে ইকোসিস্টেম
- নগর দূষণে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথ্যা ওষুধ দিব কোথা’
- পরিবেশকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবে
পরিবেশ দূষণ নিয়ে ওয়েবিনারআয়োজক: মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস
মিডিয়া পার্টনার: দৈনিক আনন্দবাজার
দেশের উন্নয়ন দর্শন নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে। আমরা কি শুধুই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকটি দেখবো না সার্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশকে মূল্যায়ন করবো। বর্তমানে সেই জায়গায় হাত দেয়ার কথা ভাবতে হবে। কেননা যে উন্নয়ন জীবনকে, অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে তা কি সত্যিই উন্নয়ন? আমাদের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবে। কেননা এখন ধরনের উন্নয়ন জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করছে সেটি উন্নয়ন কিনা? এসব উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি না মানবজীবনের জন্য হুমকি তৈরি করছে কিনা।
‘পরিবেশ-প্রতিবেশ দূষণে হুমকিতে জনজীবন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে সভাপ্রধানের বক্তব্যে এ কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. এ এইচ এম সাদাত। তিনি আরো বলেন, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়েই আমরা মূলত পরিবেশকে ধ্বংস করছি। এখান থেকে সরে আসতে গেলে উয়ন্নন ভাবনা যেমন বাদলাতে হবে, তেমনি পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অধ্যাপক ড. সাদাত বলেন, শুধু ঢাকা বা শহরাঞ্চলের উন্নয়ন পুরো দেশের উন্নয়ন নয়। এই উন্নয়নে পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করছে তাকে কীভাবে উন্নয়ন বলা যায়। অতএব উন্নয়ন হতে হবে সার্বিক কল্যাণে। তিনি আরো বলেন, ঢাকায় বসবাসরতের গড় আয়ু ৫ হতে ৭ বছর কমে যাচ্ছে পরিবেশ দূষণে। আমাদের কোনো আইন কার্যকর হবে না, যা সমাজ না নেবে। এটি সাধারণ মানুষকে আমরা জানাতে পারি নাই। পৃথিবীর ব্যালেন্স নষ্ট হলে বসবাসের যোগ্যতা হারাবে। হয়তো পৃথিবী থাকবে কিন্তু কোনো প্রাণ বা প্রাণী থাকবে না।
গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটসের উদ্যোগে আয়োজিত ওয়েবিনারের মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক আনন্দবাজার। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইএনটি অ্যান্ড হেড-নেক সার্জারি বিভাগের প্রধান এবং অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মনি লাল আইচ লিটু। তিনি মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, আমরা ৫ বাজার বছর আগের বনের পরিবেশে ফিরে যেতে পারবো না। তবে পরিবেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে করে সবাই সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
ডা. মনি লাল আইচ লিটু বলেন, পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের বয়স ৪ মিলিয়ন বছর। আমাদের জীবনধারণটি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেননা আমরা সূর্য ডুবলে ঘুমিয়ে যায় ও সূর্য উঠলে জেগে উঠি। পৃথিবীতে এটির সময়কাল ২৪ ঘণ্টা ও মঙ্গলগ্রহে ২৪.২ ঘণ্টা। সেভাবেই আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্য গঠিত ও পরিচালিত হয়। ২০ হাজার বছর আগে আমরা বনজঙ্গল, পাহাড়-পর্বত ও নদী বা সাগরের নিকটে বসবাস করতাম। সে কারণেই আমরা অবসরে সেসব জায়গায় চলে যাই। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর। আলোকের কারণে জীবনে দুশ্চিন্তা ও ম্যানিয়া দেখা দিয়েছে। ঘুম কম হচ্ছে, মানসিক বৈকল্য দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় আমরা শিল্প-কলকারখানা, বিদ্যুৎ, মোবাইল, তথ্য-প্রযুক্তিকে অস্বীকার করতে পারি না। তবে এসবের ভালো ব্যবহার করতে পারি।
ওয়েবিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। তিনি বলেন, জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া শব্দের পরিমাপ আমরা অনেক আগেই অতিক্রম করেছি। দেশের শব্দ ও বাতাসের দূষণ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, তা থেকে সহজে ফিরে আসাটা কঠিন। এ নিয়ে পথেঘাটে কাজ করতে গিয়ে আমার নিজের কানই সমস্যা দেখা দিয়েছে। দুটি কানের শ্রবণ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ক্যাপসের চেয়ারম্যান আরো বলেন, নগর অঞ্চলের পরিবেশ দূষণের অবস্থা এমন যে এখানে সর্বাঙ্গে ব্যথ্যা ওষুধ দিব কোথা? পরিবেশের কোনো উপাদানই আসলে এখানে ভালো নেই। শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ এমনকি আকাশ পর্যন্ত দূষিত হয়ে যাচ্ছে। দূষণে দূষণে একাকার। ঢাকা শহরসহ অন্য শহরের শব্দের মান মাত্রায় দ্বিগুণের বেশি দূষণ হচ্ছে। প্রধান শব্দ দূষণের উৎস গাড়ির হর্ন। ৮০ ভাগই হর্ন থেকেই হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত হাইড্রোলিক হর্ন ৩০ ভাগ গাড়িতে লাগানো আছে। এটির কারণে স্থায়ী বধিরতা হতে পারে। গর্ভের বাচ্চাও ক্ষতির শিকার হয়। ড. মজুমদার আরো বলেন, ঢাকার নীরব এলাকায় দিগুণের বেশি শব্দ দূষণ হচ্ছে। সাধারণ এলাকায় ৯০ ভাগ সময়েই মান মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা বলেন, শব্দদূষণের কারণে ইকোসিস্টেম নষ্ট হচ্ছে। তাতে শুধু মানুষ নয় প্রাণিজগতও হুমকির মুখে পড়েছে। পশু-পাখি, সামুদ্রিক প্রাণিগুলোর জীবনাচার নষ্ট হচ্ছে। তিনি একটি ঘুঘু পাখির উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমার বাসার পাশে একটি ঘুঘু পাখিকে ডাকতে দেখলাম কিন্তু তার ডাকে যে অপর পাখিটি সাড়া দেবে তা শব্দ দূষণের কারণে হচ্ছে না। এই শব্দদূষণের কারণে পাখিরা পথ হারিয়ে প্রাণবিসর্জন দিচ্ছে। তিনি বলেন, সামদ্রিক জীবনাচার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য ব্যবস্থায় বিরাট সমস্যা তৈরি হবে।
পরিবেশচিন্তক ও দৈনিক আনন্দবাজারের বার্তা সম্পাদক নিয়ন মতিয়ুলের উপস্থাপনায় ওয়েবিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক সংগঠনটির আহ্বায়ক ফারুক আহমাদ আরিফ। আলোচনায় আরো অংশ নেন ড. মাহমুদা পারভিন ও ড. গুলশান আরা লতিফা। এ ছাড়াও গণমাধ্যমে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ। প্রযুক্তিতে ছিলেন জীম মণ্ডল ও শাকিরুল হক তরু।









