- নাব্যতা সংকটে ব্যাহত ফেরি-নৌ চলাচল
উপকূলীয় জনপথ পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর কঁচা ও বলেশ^র নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবো চর। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই এখানকার অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানি প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় বিভিন্ন নদী বক্ষে জেগে উঠেছে ছোট বড় অসংখ্য ডুবোচর। এতে দেশি-বিদেশি নৌযানগুলোর চলাচল এখন হুমকির সম্মুখীন। নির্দিষ্ট গতিপথ ছাড়া ভাটির সময় দেশি-বিদেশি বড় জাহাজগুলো চলাচল করতে পারছেনা। এতে নদী বক্ষে ডুবোচর আর পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় ফেরি চলাচলসহ উপকূলীয় নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল হতে বসেছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এ নদী পথটিতে গত ৬ থেকে ৭ বছর ধরে নৌযান চলাচল একেবারেই কমে গেছে।
পিরোজপুর তথা দক্ষিণাঞ্চলের নদী পথই অর্থনৈতিক বাণিজ্যের অন্যতম উৎস বিধায় এখানকার ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল আমদানি-রপ্তানি মূলত নৌযানের মাধ্যমেই করে থাকেন। তবে শীত-গ্রীষ্ম মৌসুমে নদ নদীর বেহাল অবস্থার কারণে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী তথা নৌযান মালিকদের বিপাকে ফেলে দিয়েছে। ডুবো চরের পাশাপাশি গত তিন মাস ধরে এসব নদ-নদীতে কচুরিপণায় ঢেকে থাকার কারণে মারাত্বক সমস্যা দেখা দিয়েছে নৌ যান চলাচলের ক্ষেত্রে। শুকনো মৌসুমে নদ-নদীর পানি প্রবাহ প্রকট ভাবে হ্রাস পাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ খালগুলো শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে ফসলি জমিতে সেচ দেয়ার মতো পানি মিলছে না এসব খালে। খরা মৌসুমে পুকুর, ডোবা-নালা পানি শূন্য হয়ে পড়ায় খাবার পানির তীব্র সংকট শুরু হয়েছে নদী বিধৌত এ অঞ্চলের মানুষের।
ঢাকা-পিরোজপুর-বরিশাল-মংলা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র নদী পথ কচার বিভিন্ন পয়েন্টে বিশাল আকৃতির চর এবং ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ভাটির সময় দেশি-বিদেশি বড় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু তাই নয় ভাটির সময় ছোট খাটো নৌযানও আটকা পড়ছে এসব ডুবোচর গুলোতে।
জানা যায়, ইন্দুরকানীর সাউদখালী গ্রাম সংলগ্ন কচা নদীর মাঝখানে ১৯৩৯ সালে প্রায় ৫শ’ একর জমি নিয়ে জেগে উঠে বিশাল আকৃতির চর। এখানে প্রায় দুই দশক আগে থেকে গড়ে উঠেছে বসতি। বর্তমানে এ চরে প্রায় ৩ শতাধিকেরও বেশি ভূমিহীন পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এর ঠিক ১ কিলোমিটার অদুরে চরখালী প্রান্তে কয়েক দশক আগে জেগে উঠে আরও একটি বিশাল চর। সেখানে বসতি গড়ে না উঠলেও চাষাবাদ হচ্ছে এবং সবুজ বনায়ন গড়ে তোলা হয়েছে। এর ঠিক পশ্চিমপ্রান্তে টগড়া ফেরিঘাট এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে জেগে উঠছে নতুন চর। এ কারণে ভাটির সময় এখানে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে প্রতিদিন। অপরদিকে মাঝের চরের ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার দুরে তুসখালী বন্দরের কাছে কচা নদীর পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে জুইন্নার চর নামে আর একটি বিশাল চর রয়েছে। এ চরে গড়ে উঠেছে এখন হরিণপালা ইকোপার্ক। আর এ পার্ক সংলগ্ন কচা নদীর মাঝখানে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার জুড়ে একটি বড় ডুবোচর জেগে উঠেছে।
অপরদিকে, এর ঠিক ২ কিলোমিটার দুরে ইন্দুরকানীর পশ্চিম কলারন গ্রামের বেঁড়িবাধ ঘেষে গত ৬ থেকে ৭ বছর আগে গাজীরহাট সংলগ্ন বলেশ^র নদীতে প্রায় ১ কি. মি. জুড়ে জেগে উঠেছে আরো একটি চর। সুন্দরবনের আবহে বিস্তৃত ছৈলা গাছে ভরপুর এ চরটির একটি অংশে বছর দেড়েক আগে গড়ে উঠেছে শ্যামলী নিসর্গ ম্যানগ্রোফ ফরেষ্ট নামে একটি পার্ক।
এছাড়া উপজেলার টগড়া ফেরীঘাট মোহনা থেকে পাড়েরহাট মৎস্য বন্দরের খাল পর্যন্ত কয়েক বছর আগে আর একটি চর জেগে ওঠায় বিভিন্ন নৌযানসহ ফিসিং বোটগুলো খালের মধ্যে দিয়ে বন্দরে ঢুকতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কঁচা ও বলেশ^র নদের মোহনায় টগড়া ফেরিঘাট এলাকার দক্ষিণ প্রান্তে গত কয়েক বছর ধরে জেগে উঠছে আর একটি বিশাল চর। দিনদিন এ চরটির বিস্তিৃতি বেড়ে চলেছে। ভাটির সময় নদীর পানি কমে গেলে বিশাল এ চরটির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। তবে দিনদিন এ চরটির আকার বাড়ায় ফেরী চলাচল মারাত্বক ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। আর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এ জন্য প্রতি শীত-গ্রীষ্ম মৌসুমে নদী খনন কাজ করতে হচ্ছে বিআইডাব্লিউটিএ’কে।
এদিকে ইন্দুরকানী বাজার সংলগ্ন বলেশ^র নদের উপর নির্মিত শহীদ ফজলুল হক মনি সেতুর উত্তর-দক্ষিণ প্রান্তে তীর ঘেঁষে প্রায় আধা কিলোমিটার জুড়ে জেগে উঠেছে ছোট একটি চর।
তবে গুরুত্বপূর্ণ এ নদী ২টির বিভিন্ন পয়েন্টে ছোট বড় অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় নদীর গতিপথ ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন হচ্ছে। আর নদী বক্ষে ইন্দুরকানী উপজেলার সীমান্তে এ চরগুলো জেগে ওঠায় ৯২.৫৫ কিলোমিটার বিস্তৃত এ উপজেলাটির ভৌগলিক অবস্থান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে এর সীমারেখা।
চন্ডিপুর-হরিনপালা ইকোপার্ক এ নিয়মিত খেয়ার মাঝি মঞ্জু জানান, কঁচা নদীর মাঝখান দিয়ে যেভাবে ডুবো চর জেগে উঠছে তাতে আর কয়েক বছরের মধ্যে এ নদী পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। শুষ্ক মৌসুমে ভাটির সময় নদীর পানি কমে গেলে আড়াআড়িভাবে নদী পার হতে গিয়ে পড়তে অনেক সময় ছোট নৌযানগুলোই ডুবোচরে আটকে যায়।
সন্ন্যাসী খেয়াঘাট এলাকার পানগুছি নদীতে নোঙ্গর করা দেশি জাহাজ এম ভি চিটাগাঙ’র স্টাফ মনির হোসেন জানান, কঁচা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে চর ও ডুবো চর জেগে ওঠায় ভাটির সময় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
বিআইডাব্লুটিএ’র টেকনিক্যাল এসিস্ট্যান্ট (সিভিল) মিরাজুর রহমান সোহেল জানান, কঁচা নদীর ১৭০০ ফুট দীর্ঘ ও ২৪০ ফুট চওড়া এলাকায় এ খনন কাজ চলমান রয়েছে। এখানে প্রায় এক লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন করা হবে। এতে টগড়া-চরখালী ফেরিসহ যাবতীয় নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে।
এ ব্যপারে ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম মতিউর রহমান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক এ নদী পথটিতে নির্বিঘ্নে দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এর নাব্যতা রক্ষার জন্য সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুবে মাওলা মো. মেহেদী হাচান বলেন, জেলার বেশ কয়েকটি নদ-নদীতে নতুন নতুন ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। তবে শীত-গ্রীষ্ম মৌসুমে নদ-নদীর পানি প্রবাহ কমে যায়। এতে ফেরি ও দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে। তবে ইন্দুরকানী উপজেলার টগড়া পয়েন্টে চর জেগে ওঠায় ভাটির সময় টগড়া-চরখালি রুটে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় সেখানে এখন আমাদের ড্রেজিং এর মাধ্যমে নদী খননের কাজ চলছে। খনন কাজ শেষ হলে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হবে।









