বর্ষার জমে থাকা পানি নামছে না কোনোভাবেই। বোরো ধানের বীজতলা তৈরি করতে পারছেন না কৃষক। প্রায় ১৫ বছর ধরে অনাবাদি কয়েক হাজার বিঘা জমি। এসবের পেছনে রয়েছে নরক খাল। বেশ কিছু বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম এ খাল। খালটি এখন কৃষকের দুঃখে রূপ নিয়েছে। এটি বয়ে গেছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়ন দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে খালটি খননের দাবি করছেন চাষিরা।
নরকা খালের উৎপত্তি ঝিনাই নদী থেকে। গোয়াপচা, ধনদা, কাইয়াডুরি, জোয়ালভাঙ্গা, কাইলাইন, আনদো ও মেঘা বিল হয়ে গোলাবাড়ি এলাকায় গিয়ে মিলিত হয়েছে বংশাই নদীতে যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিলোমিটার। এলাকাবাসী জানায়, বর্ষা মৌসুমে দেওপাড়া, ধলাপাড়া ও দিগড় ইউনিয়নের প্রায় ৩০ গ্রামের বৃষ্টির পানি জমা হয় ওইসব বিলে। আর বিলের পানি নিষ্কাশন হয় নরকা খাল দিয়ে। খাল নয়, এক সময় ছিল ছোটখাটো নদীর মতো। প্রস্থ ছিল প্রায় ৪০ ফুট। বড় বড় নৌকা চলত। এখন ডিঙি নৌকাও চলতে পারে না। সরকারি উদ্যোগে প্রায় ৩০ বছর আগে একবার খালটি খনন করা হয়। এরপর পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। আগ্রাসী ভূমিকায় খালের দুই পাশের জমির মালিকও চেপে ধরেছেন। কোনো কোনো স্থানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান কোথাও ৩ ফুট, আবার কোথাও ৫ ফুট। যেন সরু নালা। দখলদারদের কারণে অস্তিত্ব সংকটে।
বোরো ধানের বীজতলা তৈরির সময় প্রায় শেষের দিকে। সরেজমিন মেঘা বিলে দেখা গেছে, বীজতলা তৈরির জমিতে এখনও হাঁটু পানি। বীজ সংকটের কারণে বাধাগ্রস্ত হবে বোরো চাষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন চাষও। দীর্ঘদিন ধরে খালটি খননের দাবি জানিয়ে আসছেন কৃষকরা। ছয় মাস আগে ৩০০ কৃষকের সই করা একটি আবেদনপত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দেওয়া হয়েছে।
নারাঙ্গাইল গ্রামের কৃষক সেলিম মিয়া বলেন, খালের চিহ্ন দেহা যায়। কয়দিন পর তাও থাকব না মনে হয়। জমিতে পানি জুইমা আছে। আমরা জালা (ধানবীজ) ফালাইবার পারতাছি না। এবার মেলা জমিতে আবাদ বন্ধ হইয়া যাইব।
কথা হয় বারইপাড়া গ্রামে কৃষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাছেদের সঙ্গে। তাঁর ভাষা, এক শতাংশ জমিতেও ধানবীজ বপন করতে পারেননি। চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছেন তাঁরা।
বাগুন্তা গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক আবু হানিফ খান জানান, বীজতলা তৈরি করতে না পারলে বোরো মৌসুমে অনাবাদি থাকবে হাজার হাজার একর জমি। বিলের জমি উর্বর। প্রতি শতাংশে ধান হয় এক মণ করে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, 'এক ইঞ্চি জমি ফাঁকা রাখা যাবে না'। তাঁর কথা বাস্তবায়ন করতে কৃষকের আগ্রহ থাকলেও প্রধান বাধা নরকার খাল। অনতিবিলম্বে এ খাল খননের দাবি জানান তিনি।
দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হেপলুর দাবি, প্রতিনিয়ত এলাকার কৃষক তার বাড়িতে ভিড় জমান কিছু একটা করে দিতে বলেন। কৃষকের দুঃখ-কষ্ট দেখে খাল খননের বিষয়ে মাসিক সমন্বয় সভায় দু বার উত্থাপন করা হয়েছে। কোনো কাজে আসছে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান জানান, কৃষক বীজতলা তৈরি করতে পারছেন না। পানিতে ধান তলিয়ে যায়। প্রতিবছর অনাবাদি থাকে অনেক জমি। এসব বিষয় তাঁর জানা। খালটি খননের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন তিনি।
ইউএনও মুনিয়া চৌধুরী জানান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার বিষয়টি জানেন তিনি। খাল খননের বিষয়ে চেয়ারম্যানকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।









