টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যার কয়েক বছর যেতে না যেতেই একই এলাকায় বাস ডাকাতি করে যাত্রীদের জিম্মি করে অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুটে নেয়ার পর একজন নারী যাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত মূল হোতা রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রুপাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। পরে মধুপুর থানা পুলিশ রুপার লাশ উদ্ধার করে। পরিচয় না পেয়ে ২৬ আগস্ট ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এরপর ২৭ আগস্ট নিহতের বড় ভাই হাফিজুর রহমান মধুপুর থানায় রক্তাক্ত লাশের ছবি শনাক্ত করেন। ৩১ আগস্ট রুপার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিন রাতেই সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আসামবাড়ি গ্রামের কবরস্থানে রুপার লাশ দাফন করা হয়। নিহত রুপা ওই গ্রামের মৃত জেলহাজ প্রামাণিকের মেয়ে। তিনি ঢাকা আইডিয়াল ‘ল’ কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।
এ ঘটনার জেরে ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি টাঈাইল জেলা আদালতে রুপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চার পরিবহণ শ্রমিক দোষী সাব্যস্থ হলে আদালত তাদের ফাঁসি ও রূপার পরিবারকে বাসটি দিয়ে দেওয়ার রায় প্রদান করে। এরপর মামলার আসামিরা এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে সেই থেকে এই মামলাটি হাইকোর্টে চলমান রয়েছে।
একইভাবে জেলার মধুপুরে চলন্ত বাসে যাত্রীদের জিম্মি করে ডাকাতি শেষে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই নারী বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাতে কুষ্টিয়া থেকে ঈগল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ২৪/২৫ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। গভীর রাতে সিরাজগঞ্জ পৌঁছালে সেখান থেকে একদল ডাকাত যাত্রীবেসে ওই বাসে ওঠে। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রীবেশে থাকা ওই তরুণ দল অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের বেঁধে ফেলে। কয়েক মিনিটের মধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নেয়। এরপর এক নারী যাত্রীকে গণধর্ষণ করে তারা। বাসটি বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে তিন ঘণ্টার মতো নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরে পথ পরিবর্তন করে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া জামে মসজিদের পাশে বালির স্তুপে বাসটি উল্টে গেলে ডাকাত দল পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় বাসের এক যাত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে টাঙ্গাইলের মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মূলহোতা রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার হয়। বিষয়টি টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার নিশ্চিত করেছে। রাজা মিয়া কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। সে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসা ভাড়া থাকতো ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঝটিকা বাসের চালক ছিলো।
ডাকাতি হওয়া ওই বাসের যাত্রী ছিলেন নাটোরের বড়াইগ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে নাটোরের তরমুজ চত্বর থেকে বাসে উঠি। বাসটি সিরাজগঞ্জের কাছাকাছি দিবারাত্রি হোটেলে নৈশভোজের জন্য বিরতি দেয়। তখন বাস থেকে নেমে অনেকেই হোটেলে খাবার খান। কড্ডার মোড়ে আসার পর ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বাসে ওঠেন। তাদের প্রত্যেকেরই পিঠে ব্যাগ ছিল। বাসে উঠে তারা খালি সিটগুলোতে বসেন। বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল। অনেক যাত্রীই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রীবেশে থাকা ডাকাত দল ঘুমন্ত যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। প্রথমে তারা ছুরি ঠেকিয়ে ড্রাইভার, হেলপার ও সুপারভাইজারকে বাসের পেছনের দিকে নিয়ে সিটের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। যাত্রীদের তারা ভীষণ নির্যাতনও করে। যাত্রীদেরও হাত, চোখ, মুখ বেঁধে ফেলা হয়। শিশুদেরও একই কায়দায় বেঁধে রাখে তারা। পরে সব যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা, গয়না লুট করে নেয়। তার পাশে বসা নারীকে গণধর্ষণ করা হয়। হাত, মুখ, চোখ বাঁধা থাকায় অন্য যাত্রীরা কিছুই করতে পারেননি। অপর যাত্রী দৌলতপুর থানার তারাগুনিয়া গ্রামের শিল্পী বেগম বলেন, ‘অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের সবাইরে হাত, মুখ, চোখ বাইন্দা ডাকাতরা সব লুট কইরা নিয়েছে। আমার স্বামী পিয়ার আলীকে ছুরি দিয়ে আঘাত করছে। আমার কাছ থিকা ৩০ হাজার টাকা নিয়া গেছে।’ বাসে থাকা অন্য নারী যাত্রীও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি।
বেসরকারি চাকরিজীবী নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আবদুর রশিদ নাটোর থেকে বাড়ি যাচ্ছিলেন অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। তিনি বলেন, ‘বেতনের ২২ হাজার ৮০০ টাকা কাছে ছিল। ডাকাতরা সেই টাকা নিয়ে গেছে।
এদিকে গণধর্ষণের শিকার ওই নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এতে ধর্ষণের আলামত মিলেছে বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের গাইনী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেহেনা পারভীন। শেখ হাসিনা মেডিক্যালের সহকারি অধ্যাপক রেহেনা পারভীন বলেন, তিন সদস্যের মেডিক্যাল টিম ওই নারীকে পরীক্ষা করেছেন। কিছু সাইন পজিটিভ আছে। সাইন অব স্ট্রাগল রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ওই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তার সোয়াব সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরে ওই নারীকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
টাঙ্গাইলের আদালতের পরিদর্শক তানভীর আহমেদ জানান, ভুক্তভোগী নারীকে জনাববন্দি দেওয়ার জন্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আনা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমকে বলেন, এ ঘটনার প্রধান আসামি রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দোষ স্বীকার করেছেন এবং এ ঘটনায় কারা কারা জড়িত ছিলেন তা জানিয়েছেন। বাকিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।









